ইতিহাস সাক্ষী, যেকোনো বড় অগ্রগতিই শুরু হয় কোনো না কোনো একটি সাহসী স্বপ্ন দিয়ে। একসময় সমুদ্র পাড়ি দেওয়াটা ছিল অসম্ভবের মতো, আকাশে ওড়া ছিল কল্পনা, আর চাঁদে পা রাখা তো ছিল কল্পবিজ্ঞানের বিষয়। মানুষের মহাকাশ অভিযানের ইতিহাসে ঠিক সেরকমই নতুন এক যুগের সূচনা করতে উদ্যত হয়েছে নাসার আর্টেমিস কর্মসূচি। এই প্রকল্পের চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো ২০৩৬ সালের মধ্যে চাঁদে একটি স্থায়ী মানব বসতি গড়ে তোলা। আর্টেমিস–২ মিশনের সফল চন্দ্রপরিক্রমার পর আগামী কয়েক বছরে একের পর এক অভিযানের মাধ্যমে চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে একটি বৈজ্ঞানিক ঘাঁটি প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা রয়েছে। এখন কথা হচ্ছে পরিকল্পনা তো বেশ চমৎকার , আকর্ষনীয়। কিন্তু বাস্তবায়ন করতে গিয়ে বেশ বেগ পোহাতে হবে বই কি। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো শক্তি কোথা থেকে আসবে? বিজ্ঞানীদের মতে, এর উত্তর একটাই: পারমাণবিক শক্তি।
চাঁদ পৃথিবীর মতো নয়। এর পরিবেশ বেজায় নির্মম। সেখানে কার্যত কোনো বায়ুমণ্ডল নেই, ফলে তাপমাত্রার ওঠানামা অত্যন্ত চরম। দিনের বেলায় তাপমাত্রা ২৫০ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে, আবার রাতের বেলায় তা নেমে যেতে পারে মাইনাস ২০৮ ডিগ্রি ফারেনহাইটে। এমন পরিবেশে মানুষের বসবাস নিশ্চিত করতে হলে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও তাপের প্রয়োজন হবে। শুধু তাই নয়, চাঁদের মাটির নীচে জমে থাকা বরফ থেকে জল সংগ্রহ, খাদ্য উৎপাদন এবং রকেটের জ্বালানি তৈরির জন্যও বিপুল পরিমাণ শক্তি দরকার হবে। সৌরশক্তি কিছুটা সহায়তা করতে পারলেও দীর্ঘমেয়াদে তা একেবারেই যথেষ্ট নয়। তাই ছোট আকারের একটি পারমাণবিক বিভাজন (ফিশন) চুল্লি স্থাপনের পরিকল্পনা করা হচ্ছে, যা একটি বহুতল অফিসের জন্য প্রয়োজনীয় সমপরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে সক্ষম হবে।
তবে এই প্রকল্পের সামনে বিপত্তিও কম নয়। প্রথমত, চাঁদের কঠোর পরিবেশে একটি পারমাণবিক চুল্লিকে টিকে থাকতে হবে। তীব্র তাপমাত্রা পরিবর্তন, চাঁদের ক্ষতিকর ধূলিকণা , মহাজাগতিক আণুবীক্ষণিক উল্কার আঘাত, কম্পন এবং দীর্ঘমেয়াদি বিকিরণ, এত সবকিছুর মোকাবিলা করতে হবে এই যন্ত্রকে। দ্বিতীয়ত, পারমাণবিক জ্বালানি পৃথিবী থেকে রকেটের মাধ্যমে চাঁদে পাঠাতে হবে, যা নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করে। তৃতীয়ত, চাঁদে বায়ুমণ্ডল না থাকায় চুল্লির অতিরিক্ত তাপ অপসারণের জন্য সম্পূর্ণ নতুন ধরনের শীতলীকরণ প্রযুক্তি তৈরি করতে হবে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রক্ষণাবেক্ষণ। চাঁদের ঘাঁটিতে মাত্র কয়েকজন নভোচারী অবস্থান করবেন, ফলে চুল্লিকে অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য ও স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে হবে। পাশাপাশি ২০৩০ সালের মধ্যেই এমন একটি প্রযুক্তির নকশা, পরীক্ষা, অনুমোদন, উৎক্ষেপণ ও স্থাপন অনেক বিশেষজ্ঞের মতে অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য।
তবুও বিজ্ঞানীরা আশাবাদী। ওয়েলসের ব্যাঙ্গর বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউক্লিয়ার ফিউচার্স ইনস্টিটিউটের সহ-পরিচালক সাইমন মিডলবার্গের মতে, দীর্ঘমেয়াদে চাঁদে মানব বসতি টিকিয়ে রাখতে পারমাণবিক শক্তির বিকল্প নেই। শুধু যুক্তরাষ্ট্রই নয়, চীন ও রাশিয়াও ২০৩৫ সালের মধ্যে চাঁদে নিজস্ব পারমাণবিক চুল্লি স্থাপনের পরিকল্পনা করছে। ফলে চাঁদ এখন আর শুধু বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের গন্তব্য নয়; এটি হয়ে উঠছে আগামী শতাব্দীর প্রযুক্তিগত ও কৌশলগত প্রতিযোগিতার নতুন মঞ্চ।
সম্ভবত খুব শিগগিরই মানবজাতি এমন এক সময়ের সাক্ষী হবে, যখন পৃথিবীর বাইরে প্রথম স্থায়ী নগরীর আলো জ্বলবে পারমাণবিক শক্তির উৎস থেকে। আর সেই আলো শুধু চাঁদের অন্ধকার দূর করবে না, মানব সভ্যতার ভবিষ্যতের পথও আলোকিত করবে।
সূত্র: https://www.ans.org/news/2025-11-14/article-7542/the-race-to-put-a-nuclear-reactor-on-the-moon/
