চিরস্থায়ী রাসায়নিক ও ভ্রূণবিকাশ

চিরস্থায়ী রাসায়নিক ও ভ্রূণবিকাশ

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ৬ এপ্রিল, ২০২৬

একটি বহুল ব্যবহৃত শিল্প-রাসায়নিক হয়তো নীরবে মানবদেহে জমা হয়ে চলেছে। গর্ভস্থ ভ্রূণের বিকাশেও সেটি প্রভাব ফেলতে পারে। সম্প্রতি বিজ্ঞানীরা এক গবেষণায় দেখিয়েছেন, ভ্রূণের মুখমণ্ডলের গঠনপ্রক্রিয়ায় ব্যাঘাত ঘটানোর সম্ভাব্য কারণ হয়তো এইসব ‘চিরস্থায়ী রাসায়নিক’। তাঁরা একটি নির্দিষ্ট জৈবিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এর কার্য-কারণ সম্পর্কও ব্যাখ্যা করেছেন। গবেষক জেড ল্যাম্পে ও তাঁর সহকর্মীরা দেখিয়েছেন, চিরস্থায়ী রাসায়নিকগুলি মায়ের যকৃতের কোষে এমন একটি প্রক্রিয়াকে বাধা দেয়, যা সাধারণত অতিরিক্ত রেটিনোয়িক অ্যাসিড ভেঙে ফেলে। এই রেটিনোয়িক অ্যাসিড ভিটামিন ‘এ’ থেকে তৈরি একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত অণু, যা গর্ভাবস্থার শুরুতে ভ্রূণের মুখ ও মাথার গঠনের কাজ করে। কোন কোষ কোথায় বাড়বে এবং কোন আকৃতি নেবে, তা এই অণুই নির্ধারণ করে। সংকেতটি অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে নিয়ন্ত্রিত হওয়া প্রয়োজন। ভ্রূণ নিজে অতিরিক্ত রেটিনোয়িক অ্যাসিড অপসারণ করতে পারে না, তাই মায়ের যকৃত সেই কাজটি করে। কিন্তু চিরস্থায়ী রাসায়নিকগুলি এই নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকেই ব্যাহত করে। গবেষণায় দেখা গেছে, চিরস্থায়ী রাসায়নিকগুলি শুধু যে এই ভাঙন প্রক্রিয়াকে সরাসরি বাধা দেয় তা নয়, এগুলি এমন একধরনের উৎসেচক তৈরি করে যা ভারপ্রাপ্ত জিনগুলোকেও দমন করে। ফলে দ্বৈত প্রভাব তৈরি হয়। একদিকে ভাঙন কমে যায়, অন্যদিকে ভবিষ্যতে ভাঙনের ক্ষমতাও হ্রাস পায়। এই প্রক্রিয়ার কেন্দ্রে রয়েছে CYP26A1 নামের একটি উৎসেচক। যার কাজ, অতিরিক্ত রেটিনোয়িক অ্যাসিডকে ভেঙে ফেলা। চিরস্থায়ী রাসায়নিকগুলি এই উৎসেচকের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে, কারণ এর গঠন রেটিনোয়িক অ্যাসিডের মতোই। ফলে এটি উৎসেচকের সক্রিয় স্থানে গিয়ে বসে পড়ে এবং স্বাভাবিক কাজকে বাধা দেয়। কম্পিউটার মডেলও দেখিয়েছে যে চিরস্থায়ী রাসায়নিকগুলি ও রেটিনোয়িক অ্যাসিড একই স্থানের জন্য প্রতিযোগিতা করে। ফলস্বরূপ, অতিরিক্ত রেটিনোয়িক অ্যাসিড ভেঙে না গিয়ে কোষে জমা হতে থাকে।

এমনকি দেখা গেছে, ৪৮ ঘণ্টা চিরস্থায়ী রাসায়নিকগুলির সংস্পর্শে থাকার পর যকৃত কোষে রেটিনোয়িক অ্যাসিডের মাত্রা নিয়ন্ত্রণের তুলনায় প্রায় ১৮২ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়। এই অতিরিক্ত অংশ মায়ের শরীর থেকে ভ্রূণে পৌঁছাতে পারে, যেখানে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল। সমস্যা এখানেই শেষ নয়। চিরস্থায়ী রাসায়নিকগুলি জিনের কার্যকারিতাতেও পরিবর্তন আনে। বিশেষ করে ভিটামিন A নিয়ন্ত্রণ ও প্রাথমিক বিকাশের সঙ্গে যুক্ত জিনগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে মুখমণ্ডলের গঠন, চোয়াল, চোখ এবং কার্টিলেজ তৈরির সঙ্গে সম্পর্কিত জৈবিক প্রক্রিয়াও ব্যাহত হতে পারে। অর্থাৎ, চিরস্থায়ী রাসায়নিকগুলি শুধু একটি ধাপকে নয়, পুরো বিকাশ প্রক্রিয়াকেই প্রভাবিত করতে পারে। চিরস্থায়ী রাসায়নিকগুলি একইসঙ্গে এনজাইমের কার্যকলাপ এবং সংশ্লিষ্ট জিনগত পথ, দুটিকেই কঠোরভাবে ব্যাহত করেছে। আগের প্রাণীভিত্তিক গবেষণায় (বিশেষ করে জেব্রাফিশে) চিরস্থায়ী রাসায়নিকগুলিকেই সবচেয়ে বিষাক্ত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল, খুব কম ঘনত্বেই যার প্রভাব দেখা যায়। মানুষের উপর গবেষণাতেও এর ইঙ্গিত মিলেছে। ডেনমার্কে ৬৫৬ টি শিশুর উপর এক সমীক্ষা চালিয়ে দেখা গেছে, চিরস্থায়ী রাসায়নিকগুলির সঙ্গে চোখের কোটরের আকার ছোট হওয়ার একটি সম্পর্ক রয়েছে। যদিও এটি সরাসরি কারণ প্রমাণ করে না, তবে নতুন গবেষণার ফলাফল সেই পর্যবেক্ষণের জৈবিক ব্যাখ্যা দেয়। চিরস্থায়ী রাসায়নিকের সংস্পর্শ বিশ্বজুড়ে খুবই সাধারণ ঘটনা। বিশেষ করে দূষিত জলের উৎস, শিল্পাঞ্চল বা কিছু পেশাগত পরিবেশে (যেমন- অগ্নি নির্বাপন) এই ঝুঁকি বেশি। সাংহাইয়ের একটি মাতৃ-শিশু সমীক্ষায় দেখা গেছে, ৯০ শতাংশের বেশি মায়ের রক্তে এবং ৫০ শতাংশের বেশি নাভির রক্তে চিরস্থায়ী রাসায়নিকগুলি উপস্থিত। এই প্রেক্ষাপটে নতুন গবেষণাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ প্রায় ১৫,০০০ চিরস্থায়ী রাসায়নিকের প্রতিটিকে আলাদাভাবে পরীক্ষা করা সম্ভব নয়। তাই কোনগুলো বেশি ঝুঁকিপূর্ণ, তা দ্রুত শনাক্ত করার জন্য এই ধরনের প্রক্রিয়াভিত্তিক গবেষণা আবশ্যিক।

 

সূত্র: Earth . com March; 2026

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

15 − eleven =