চেতনাসীমানার বাইরে

চেতনাসীমানার বাইরে

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২৬ মার্চ, ২০২৬

পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে স্বাভাবিকভাবেই খুব ক্ষীণ একধরনের তড়িৎচুম্বক তরঙ্গ সব সময় ঘুরে বেড়ায়। সাম্প্রতিক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা দেখছেন, মানুষের মস্তিষ্ক হয়তো এই সূক্ষ্ম তরঙ্গগুলোর প্রতি কোনোভাবে সাড়া দিতে পারে। অর্থাৎ আমাদের চেতনা শুধু মস্তিষ্কের ভেতরেই সীমাবদ্ধ নয়, বাইরের পরিবেশের সঙ্গেও এর কোনো যোগাযোগ থাকতে পারে। মস্তিষ্কের ভেতরে প্রতিটি নিউরনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো তার ঝিল্লি বা মেমব্রেন। এই পাতলা স্তরেই বৈদ্যুতিক সংকেত তৈরি হয় এবং ছড়িয়ে পড়ে। ইতালির ‘পলিটেকনিকো দি তোরিনো’-র অবেদন-বিশারদ (অ্যানেস্থেসিয়োলজিস্ট) মার্কো কাভালিয়া মনে করেন, এই মেমব্রেন একটি নিষ্ক্রিয় আবরণ নয়, আসলে এটি সক্রিয়ভাবে মস্তিষ্কের সংকেতকে প্রভাবিত করে। তার মতে, মেমব্রেনের দৃঢ়তা, বৈদ্যুতিক চার্জ এবং সংকেতের সময়কাল, এই সবকিছু মিলেই নির্ধারিত হয় মস্তিষ্কের কার্যকলাপ কতটা স্থিতিশীল হবে। এই ধারণা অনুযায়ী, মানসিক স্থিরতা শুধু নিউরনের ওপর নির্ভর করে না, তা ঝিল্লি জাতীয় সূক্ষ্ম উপাদানের ওপরেও নির্ভরশীল হতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে স্নায়ুবিজ্ঞানে যেগুলোকে খুব বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়নি, সেই উপাদানগুলোই এখানে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

এবার আসা যাক, বাইরের পরিবেশের প্রভাব প্রসঙ্গে। পৃথিবীতে বজ্রপাতের কারণে বায়ুমণ্ডলে একধরনের তড়িৎচুম্বক তরঙ্গ তৈরি হয়, যাকে বলা হয় ‘শুমান রেজোন্যান্স’। এই তরঙ্গের প্রধান কম্পাঙ্ক প্রায় ৭.৮৩ হার্টজ। আশ্চর্যের বিষয়, মানুষের মস্তিষ্কেও ঠিক একই রকম কম্পাঙ্কের তরঙ্গ দেখা যায়, বিশেষ করে বিশ্রামের সময়। তবে শুধু একই সংখ্যা পাওয়া মানেই যে দুটির মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক আছে, তা নয়। গবেষকরা বলছেন, এটি কেবল একটি সম্ভাব্য সংযোগের ইঙ্গিত। প্রশ্ন হচ্ছে, মস্তিষ্ক কি এই বাইরের ছন্দের সঙ্গে কোনোভাবে তাল মেলায়? এই তত্ত্বে জলের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। ঝিল্লির পাশে থাকে এক বিশেষ ধরনের সুসংগঠিত জলের স্তর, যাকে ‘ভিসিনাল ওয়াটার’ বলা হয়। ধারণা করা হচ্ছে, এই স্তর দুর্বল তড়িৎচৌম্বক সংকেতকে কিছুক্ষণ ধরে রাখতে পারে, যাতে তা কোষের ভেতরে প্রভাব ফেলতে পারে। পাশাপাশি ‘সেরিব্রোস্পাইনাল ফ্লুইড’ বা মস্তিষ্ক-মেরুদণ্ডের তরলও সংকেত ছড়িয়ে দেওয়ার একটি সম্ভাব্য মাধ্যম হতে পারে। ঝিল্লির গঠন পরিবর্তিত হয়। এর বেধ, নমনীয়তা এবং বৈদ্যুতিক বৈশিষ্ট্য সবই পরিবর্তনশীল। ফলে এটি অনেকটা বাদ্যযন্ত্রের মতো কাজ করে, যেখানে একই সুর ভিন্নভাবে শোনা যায়। এই গবেষণায় আরেকটি তত্ত্বের কথা বলা হয়েছে, ‘এনার্জি–ম্যাস–ইনফরমেশন’ মডেল। চিন্তা বা চেতনা হল, শক্তি, বস্তু এবং তথ্যের এক চলমান ভারসাম্য। এখানে ‘অ্যাট্র্যাক্টর’ নামে কিছু স্থিতিশীল অবস্থা থাকে, যেগুলোর দিকে মস্তিষ্ক বারবার ফিরে যায়। এরই মারফত আমাদের স্মৃতি, অনুভূতি এবং নিজের সত্তার ধারাবাহিকতা বজায় থাকে।

মানুষের মধ্যে সমন্বিত অভিজ্ঞতার ক্ষেত্রেও এই তত্ত্ব প্রযোজ্য। যেমন, একসঙ্গে গান গাওয়া, জপ করা বা একই তালে নড়াচড়া করার সময় অনেক মানুষের শ্বাস-প্রশ্বাস ও মনোযোগ এক ছন্দে চলে আসে। ‘হাইপারস্ক্যানিং’ প্রযুক্তি ব্যবহার করে দেখা গেছে, এমন পরিস্থিতিতে একাধিক মানুষের মস্তিষ্কের কার্যকলাপেও মিল দেখা যায়। অর্থাৎ সামাজিক অভিজ্ঞতা মস্তিষ্কে পরিমাপযোগ্য প্রভাব ফেলে। তবে এই পুরো ধারণাটি এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। শুধু কম্পাঙ্কের মিল পাওয়াই যথেষ্ট নয়। জীবন্ত দেহে প্রচুর বৈদ্যুতিক গোলমাল থাকে, এবং খুব দুর্বল বাইরের সংকেত সেই গোলমালের মধ্যে টিকে থাকতে পারবে কি না, সেটাই বড় প্রশ্ন। তাই গবেষকরা জোর দিচ্ছেন পরীক্ষার ওপর। ঝিল্লির গঠন বদলালে কি মস্তিষ্কের সংকেতের স্থিরতা বদলায়? অবেদনিক অবস্থায় (অ্যানেস্থেসিয়া) বা মানসিক রোগে কি এর প্রভাব দেখা যায়? এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই ঠিক করবে তত্ত্বটি কতটা বাস্তবসম্মত। যদি এই ধারণা আংশিকভাবেও সত্যি প্রমাণিত হয়, তাহলে এর প্রভাব প্রথমে চিকিৎসাবিজ্ঞানে পড়তে পারে। অচেতনতা, মানসিক রোগ বা স্নায়ুর অবক্ষয়ের মতো সমস্যাকে নতুনভাবে বোঝা সম্ভব হবে। সবশেষে বলা যায়, এই গবেষণা এখনও প্রমাণ দেয়নি, মানুষের মস্তিষ্ক সত্যিই পৃথিবীর ছন্দ শুনতে পায় কি না। তবে এটি জীববিজ্ঞান, স্নায়ুবিজ্ঞান এবং পদার্থবিজ্ঞানের মধ্যে এক নতুন সংযোগ তৈরি করছে। এখন অপেক্ষা, পরীক্ষাগুলো থেকে কী বেরিয়ে আসে- সেই অদৃশ্য ছন্দ কি সত্যিই আমাদের মনের স্থিরতায় ভূমিকা রাখে, নাকি এটি নেহাত এক আগ্রহ-জাগানো কৌতূহলোদ্দীপক মিল!

 

সূত্র: Toward a holographic brain paradigm: a lipid-centric model of brain functioning; Politecnico di Torino; Frontiers in Neuroscience.; March 2026.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

five × 1 =