সমুদ্রের এক বিশেষ প্রাণী চিটন। চিটন হচ্ছে ছোট মোলাস্ক, যাদের দেহ আটটি শক্ত খোলক চাকতি দিয়ে ঢাকা। একে এক ধরনের ‘জীবন্ত ট্যাংক’ বলা যায়। বিজ্ঞানীদের সামনে এই চিটনের চোখ-ই তুলে ধরছে বিবর্তনের এক গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। যাকে পথ-নির্ভরতা ( ‘পাথ-ডিপেনডেন্স’) বা অতীতনির্ভর বিবর্তন বলা হয়। অর্থাৎ, কোনো প্রজাতির ভবিষ্যৎ বিবর্তন তার অতীতের গঠন ও সীমাবদ্ধতার উপর নির্ভর করে গড়ে ওঠে।
চিটনের শরীরে অসংখ্য ক্ষুদ্র চোখ আছে, যা তার শক্ত খোলের উপর ছড়িয়ে থাকে। জীবনের শুরুতে তাদের চোখের সংখ্যা কম থাকলেও বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নতুন চোখ যুক্ত হতে থাকে। কখনও সংখ্যা পৌঁছায় শতাধিকেও। প্রায় ৩০০ মিলিয়ন বছর ধরে তাদের শরীরের গঠন খুব একটা বদলায়নি। তাদের এই শক্ত খোল নিছক সুরক্ষা দেয় না, এতে থাকে নানা সংবেদনশীল অঙ্গ, যা আলো, রাসায়নিক সংকেত ও স্পর্শ বুঝতে সাহায্য করে। গবেষণায় দেখা গেছে, চিটনের চোখ মূলত দু-ধরনের। হাজার হাজার ক্ষুদ্র আলো-সংবেদী নয়ন বিন্দু এবং কম সংখ্যক কিন্তু লেন্স ও রেটিনাযুক্ত জটিল চোখ। আশ্চর্যের বিষয়, এই দুই ধরনের চোখ আলাদা আলাদা সময়ে দু’বার করে স্বাধীনভাবে তৈরি হয়েছে। অর্থাৎ, একই প্রজাতির ভিন্ন বংশধারা একসঙ্গে দুই ধরনের চোখ কখনই তৈরি করেনি, একটি পথই বেছে নিয়েছে। গবেষণার পরিচালক রেবেকা ভার্নে জানান, এটি পথনির্ভর বিবর্তনের একটি স্পষ্ট উদাহরণ। বিবর্তনের ধারায় একবার কোনো পথে গেলে অন্য পথ প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। গবেষকরা ১০০-র বেশি চিটন প্রজাতির ডিএনএ বিশ্লেষণ করে একটি বিশদ বিবর্তনী বংশ-লতিকা তৈরি করেন। সেখানে দেখা যায়, জটিল চোখ তৈরির আগে খোলের উপর এস্থেট নামের সংবেদনশীল গঠনের ঘনত্ব বাড়তে থাকে। এই ধাপ না হলে চোখের বিকাশ সম্ভব নয়। এরপর আরও চমকপ্রদ তথ্য সামনে আসে। চিটন চারবার স্বাধীনভাবে চোখ তৈরি করেছে, তাও খুব দ্রুত গতিতে। মাত্র ৭ মিলিয়ন বছরের মধ্যেই কিছু প্রজাতিতে চোখের বিন্দু গড়ে উঠেছে। বিবর্তনের ধারা হিসেবে এটি অত্যন্ত দ্রুত। সহ-গবেষক ড্যান স্পেইসার প্রথমে মনে করেছিলেন, বিবর্তন বুঝি ধাপে ধাপে এগিয়েছে। প্রথমে সহজ খোলের উপর ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সংবেদি গঠন এস্থেট, তারপর আলোর সেন্সার, শেষে খোলের উপর থাকা এক ধরনের জটিল চোখ তৈরি হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল, দৃষ্টিশক্তি পাওয়ার জন্য একাধিক পথ রয়েছে। এটি কোনো সরল একরৈখিক প্রক্রিয়া নয়। তাহলে প্রশ্ন, কেন কেউ নয়নবিন্দু তৈরি করে, আর কেউ বানায় জটিল খোলক চোখ? গবেষকরা খুঁজে পান এক অদ্ভুত কারণ- চিটনের খোলের ফাঁকের সংখ্যা। এই ফাঁক দিয়ে স্নায়ু প্রবেশ করে চোখের সঙ্গে যুক্ত হয়। বেশি ফাঁক মানে বেশি স্নায়ু প্রবেশের সুযোগ। যা হাজার হাজার নয়নবিন্দু তৈরিতে সহায়ক। অন্যদিকে কম ফাঁক থাকলে অপেক্ষাকৃত কম কিন্তু বড় খোলক চক্ষু তৈরি হয়। লরেন রুনি মনে করেন, এই কারণ খোলের আকার বৃদ্ধির সঙ্গেও যুক্ত। চিটনের খোল কেন্দ্র থেকে প্রান্তের দিকে বাড়ে, এবং বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাতে নতুন চোখ যুক্ত হয়। ফলে খোলের গঠন ও শক্তি বজায় রাখতে কতগুলো ছিদ্র করা যাবে, সেটাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। অতিরিক্ত বা বড় ছিদ্র খোলকে দুর্বল করে দিতে পারে। তাই গঠনগত সীমাবদ্ধতাও ঠিক করে দেয়, কোন ধরনের চোখ তৈরি হবে। গবেষণাটি এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে ড্যান মনে করেন, ভবিষ্যতে এটি বিবর্তনবিদ্যার পাঠ্যবইয়ে জায়গা করে নেবে।
সূত্র: Nautilus ; Evolution
