এতদিন পদার্থবিজ্ঞানে প্রচলিত ধারণা ছিল, চৌম্বক ক্রিয়ার মাত্র দুটি মৌলিক রূপ রয়েছে—i)ফেরোম্যাগনেটিজম/চৌম্বক আকর্ষী ধর্ম এবং ii)অ্যান্টিফেরোম্যাগনেটিজম/চৌম্বক বিকর্ষী ধর্ম । ফেরোম্যাগনেটিক পদার্থে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র চৌম্বক ভ্রামক ( চৌম্বক শক্তির পরিমাপক ) একই দিকে সারিবদ্ধ থাকায় শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্র সৃষ্টি হয়। সাধারণ চুম্বক, হার্ডডিস্ক এবং বিভিন্ন ইলেকট্রনিক যন্ত্রে এই বৈশিষ্ট্যই কাজে লাগানো হয়। বিপরীতে, অ্যান্টিফেরোম্যাগনেটিক পদার্থে পাশাপাশি থাকা চৌম্বক ভ্রামকগুলো বিপরীতমুখী হওয়ায় তারা পরস্পরকে বাতিল করে দেয় এবং বাইরে থেকে কোনো নিট চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরি হয় না।
এবার এই বহু প্রাচীন ধারণায় যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছেন বিজ্ঞানীরা। তাঁরা পরীক্ষামূলকভাবে নিশ্চিত করেছেন বিকল্প চৌম্বক ক্রিয়া বা ‘অল্টারম্যাগনেটিজম’ নামক চৌম্বকত্বের এক নতুন মৌলিক রূপের অস্তিত্ব। এই আবিষ্কার পদার্থবিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এটি ভবিষ্যতের কম্পিউটিং, তথ্য সংরক্ষণ এবং স্পিনট্রনিক্স প্রযুক্তির জন্যও নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে। এই গবেষণার বিস্তারিত বিবরণ প্রকাশিত হয়েছে নেচার পত্রিকায়।
অল্টারম্যাগনেটিজমের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো, এটি ফেরোম্যাগনেটিজম ও অ্যান্টিফেরোম্যাগনেটিজম—উভয় ধরনের চৌম্বক ধর্মের সুবিধাকেই একসঙ্গে ধারণ করে। যেহেতু এই পদার্থে কোনো সামগ্রিক চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরি হয় না, ফলে বাইরের চৌম্বক হস্তক্ষেপের প্রভাব অত্যন্ত কম। একই সঙ্গে এতে ইলেকট্রনের স্পিন অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব, যা তথ্য সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াকরণ এবং উচ্চগতির ইলেকট্রনিক ডিভাইস তৈরির ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।
গবেষকদের মতে, অল্টারম্যাগনেটিক উপাদান ব্যবহার করে এমন ডিজিটাল মেমোরি তৈরি করা সম্ভব হতে পারে, যা বর্তমান প্রযুক্তির তুলনায় প্রায় এক হাজার গুণ দ্রুত কাজ করবে। একই সঙ্গে এসব ডিভাইসের বিদ্যুৎ খরচও উল্লেখযোগ্যভাবে কম হবে। ফলে ভবিষ্যতের কম্পিউটার হবে আরও দ্রুত, অধিক শক্তি-সাশ্রয়ী এবং নির্ভরযোগ্য। আশা করা যাচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কম্পিউটিং, ডেটা সেন্টার এবং পরবর্তী প্রজন্মের ইলেকট্রনিক যন্ত্রে এই প্রযুক্তির ব্যাপক প্রভাব পড়তে পারে।
যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব নটিংহ্যাম–এর গবেষকদের নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক একটি দল প্রথমবারের মতো পরীক্ষার মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন যে অল্টারম্যাগনেটিজম বাস্তবেই বিদ্যমান এবং ক্ষুদ্রাকৃতির ইলেকট্রনিক ডিভাইসেও এর বৈশিষ্ট্য কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। এতদিন এই ধারণা মূলত তাত্ত্বিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ ছিল; নতুন গবেষণা সেটিকে বাস্তব পরীক্ষায় প্রতিষ্ঠিত করেছে।
এই আবিষ্কারের গুরুত্ব কেবলমাত্র দ্রুতগতির মেমোরি প্রযুক্তিতে সীমাবদ্ধ নয়। বিজ্ঞানীদের মতে, এটি উচ্চ-তাপমাত্রার অতিপরিবাহিতা সম্পর্কিত অন্যতম জটিল বৈজ্ঞানিক রহস্য উন্মোচনেও সহায়ক হতে পারে। এমন অতিপরিবাহী তৈরি করা সম্ভব হবে, যেটা অপেক্ষাকৃত বেশি তাপমাত্রায়ও প্রায় শূন্য বৈদ্যুতিক প্রতিরোধে বিদ্যুৎ পরিবহন করতে পারবে। এটা আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। কিন্তু অল্টারম্যাগনেটিজম সেই গবেষণায় সত্যিই একটা নতুন দৃষ্টিভঙ্গি এনে দিতে পারে।
এই গবেষণার মাধ্যমে চৌম্বক ক্রিয়া সম্পর্কে দীর্ঘদিনের বৈজ্ঞানিক ধারণা এক নতুন মাত্রা পেয়েছে।
সূত্র: Nature; University of Nottingham.
