বৃহস্পতি তার বড় বড় উপগ্রহগুলিকে ধরে রাখতে পেরেছে। এর কারণ, গ্রহটির চারপাশে ঘুরন্ত গ্যাসের তৈরি একটি চুম্বকীয় গহ্বর। অন্যদিকে, শনি এমন কোনো কাঠামো তৈরি করতে পারেনি। এই পার্থক্যই ব্যাখ্যা করে কেন বৃহস্পতি ও শনি হয়তো একই ধরনের উপাদান দিয়ে তৈরি হলেও এই দুই দৈত্য গ্রহের বড় উপগ্রহগুলির বিন্যাস এত আলাদা। বৃহস্পতির চারপাশে বড় উপগ্রহগুলি কাছাকাছি গুচ্ছ আকারে টিকে আছে, অথচ শনির ক্ষেত্রে বেশিরভাগ বড় উপগ্রহ হারিয়ে গেছে। পড়ে রয়েছে কেবল টাইটান। এই পার্থক্যের শিকড় খুঁজতে গিয়ে কিয়োটো বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ইউরি আই. ফুজি দেখিয়েছেন, বৃহস্পতির শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্র উপগ্রহগুলিকে বাঁচিয়ে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। সাধারণত, নতুন তৈরি উপগ্রহগুলি গ্যাসের টানে ধীরে ধীরে গ্রহের দিকে এগিয়ে যায়। কিন্তু বৃহস্পতির ক্ষেত্রে, চুম্বকীয় গহ্বরটি এক বাধা হিসেবে কাজ করেছে। ফলে উপগ্রহগুলি সরাসরি গ্রহের মধ্যে পড়ে না গিয়ে, ঐ সীমার কাছে জমা হতে পেরেছে এবং সেখানেই স্থিতিশীল অবস্থায় থেকে গেছে। অন্যদিকে, শনির চারপাশে এমন কোনো নিরাপদ অঞ্চল ছিল না। ফলে উপগ্রহগুলি ধীরে ধীরে ভেতরের দিকে সরে গিয়ে শেষ পর্যন্ত গ্রহের মধ্যেই পড়েছে। আসলে নতুন কোনো গ্রহ গঠনের সময় তার চারপাশে ‘সার্কামপ্ল্যানেটারি ডিস্ক’ নামে গ্যাস ও ধুলোর একটি ঘূর্ণায়মান স্তর তৈরি হয় আর সেখানেই উপগ্রহের জন্ম। কিন্তু এই একই গ্যাস আবার উপগ্রহগুলোকে ধীরে ধীরে ভেতরের দিকে টেনে নিয়ে যায়। যদি এই চাকতির ভেতরের অংশে একটি ফাঁক তৈরি হয়, তাহলে উপগ্রহগুলি ভেতরে পড়ে যাওয়ার বদলে, সেই প্রান্তে জমা হতে পারে। সেই কারনেই তরুণ বৃহস্পতির ক্ষেত্রে প্রথম বড় উপগ্রহটি এই চৌম্বক বাধার কাছে থেমে যায় এবং পরে আসা উপগ্রহগুলো তার পেছনে সারি বেঁধে স্থির হয়। এর ফলে আইও, ইউরোপা এবং গ্যানিমিড একধরনের কক্ষপথগত অনুরণনে (অরবিটাল রেজোন্যান্স) আবদ্ধ হয়ে স্থিতিশীল থাকে। আর ক্যালিস্টো কিছুটা দূরে থেকে যায়, কারণ এটি ধীরে তৈরি হয়েছিল। কিন্তু শনির ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন ছিল। তার চৌম্বক ক্ষেত্র অপেক্ষাকৃত দুর্বল হওয়ায় ওই রকম কোনো ব্যবধান তৈরি হয়নি। ফলে উপগ্রহগুলোকে থামানোর মতো কোনো বাধা ছিল না। বর্তমানে বৃহস্পতির ১০০-র বেশি এবং শনির ২৮০-র বেশি উপগ্রহর কথা জানা গেছে। কিন্তু শুধু সংখ্যাই এখানে আসল বিষয় নয়। বিজ্ঞানীদের মতে, বড় গ্যাসীয় গ্রহগুলির শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্র থাকলে তারা একাধিক বড় উপগ্রহ ধরে রাখতে পারে। কিন্তু শনির মতো গ্রহে হয়তো এক বা দুটি দূরের বড় উপগ্রহই থাকবে। ভবিষ্যতে নবজাত গ্রহগুলোর চারপাশের গ্যাস পর্যবেক্ষণ করে এই তত্ত্ব পরীক্ষা করা যেতে পারে।
সূত্র: Nature Astronomy; Earth . com ; April, 2026
