জলবায়ুর বরফবন্দী ইতিহাস

জলবায়ুর বরফবন্দী ইতিহাস

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২৫ মে, ২০২৬

অ্যান্টার্কটিকার বরফের গভীরে লুকিয়ে ছিল পৃথিবীর জলবায়ুর এক চাঞ্চল্যকর ইতিহাস। এবার সেই ইতিহাসেরই সবচেয়ে দীর্ঘ ও ধারাবাহিক অধ্যায় উন্মোচন করেছেন ইউরোপের একদল বিজ্ঞানী। প্রায় ২.৮ কিলোমিটার গভীর থেকে তোলা বরফের স্তম্ভ বা “আইস কোর’’ বিশ্লেষণ করে তাঁরা পৃথিবীর গত ১২ লক্ষ বছরের জলবায়ু ও বায়ুমণ্ডলের রেকর্ড উদ্ধার করেছেন। এ গবেষণা শুধু অতীতের আবহাওয়া বোঝার জন্য নয়, বর্তমান জলবায়ু সংকট এবং ভবিষ্যতের পরিবর্তন সম্পর্কে ধারণা দিতেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

অ্যান্টার্কটিকার বরফ আসলে এক বিশাল প্রাকৃতিক আর্কাইভ। প্রতি বছর তুষারের নতুন স্তর জমতে জমতে পুরোনো স্তরগুলো বরফে পরিণত হয়। সেই বরফের ভেতরে আটকে থাকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বায়ুবুদবুদ, যা অতীতের বায়ুমণ্ডলের নমুনা হিসেবে কাজ করে। বিজ্ঞানীরা এই বুদবুদ বিশ্লেষণ করে জানতে পারেন, হাজার হাজার বছর আগে পৃথিবীর বাতাসে কতটা কার্বন ডাই-অক্সাইড ছিল এবং তখন পৃথিবীর তাপমাত্রা কত ছিল।

এই গবেষণাটি পৃথিবীর “মিড-প্লাইস্টোসিন ট্রানজিশন’’ নামে পরিচিত এক রহস্যময় সময়ের তথ্য তুলে ধরেছে। প্রায় ১০ লক্ষ বছর আগে পৃথিবীর হিম যুগের ধরনে হঠাৎ বড় পরিবর্তন ঘটে। তার আগে প্রায় প্রতি ৪০ হাজার বছর অন্তর অন্তর হিম যুগ আসত। কিন্তু পরে সেই ব্যবধান বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ১ লক্ষ বছরে। একই সঙ্গে হিম যুগগুলো হয়ে ওঠে আরও দীর্ঘ, আরও শীতল এবং আরও ভয়ংকর।

কেন এই পরিবর্তন ঘটেছিল, তা এখনও পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। বিজ্ঞানীদের ধারণা, বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইডের মাত্রা হঠাৎ কমে যাওয়ার সঙ্গে এর সম্পর্ক থাকতে পারে। কারণ গ্রিনহাউস গ্যাস পৃথিবীর তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। যদি কার্বন ডাই-অক্সাইড কমে যায়, তাহলে পৃথিবী আরও দ্রুত ঠান্ডা হতে পারে এবং দীর্ঘস্থায়ী হিমযুগ তৈরি হতে পারে। তবে এই ধারণা যাচাই করার জন্য প্রয়োজন ছিল এমন একটি রেকর্ড, যেখানে একই সঙ্গে তাপমাত্রা ও বায়ুমণ্ডলের গ্যাসের তথ্য পাওয়া যায়। অ্যান্টার্কটিকার এই আইস কোর সেই সুযোগ এনে দিয়েছে।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, বরফের ভেতরে এখনও বিপুল তথ্য লুকিয়ে আছে। ভবিষ্যতে আরও বিশ্লেষণের মাধ্যমে পৃথিবীর জলবায়ুর ইতিহাস সম্পর্কে নতুন নতুন রহস্য উন্মোচিত হতে পারে। আজ মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তন বিশ্বজুড়ে উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। আমাদের পৃথিবীর জলবায়ু অত্যন্ত স্পর্শকাতর , বায়ুমণ্ডলের কার্বন ডাই-অক্সাইডের সামান্য পরিবর্তনও দীর্ঘমেয়াদে বিশাল প্রভাব ফেলতে পারে। তাই অতীতের এই দীর্ঘ জলবায়ুর রেকর্ড আমাদের খুবই কাজে লাগবে।

 

সূত্র -British Antarctic Survey/SPL

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

one × 5 =