জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি ও কর্পোরেট দুনিয়া

জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি ও কর্পোরেট দুনিয়া

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২৩ অক্টোবর, ২০২৬

পৃথিবীর জীববৈচিত্র্য রক্ষায় বড় বড় সংস্থার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু নিজেদের ব্যবসা ও উৎপাদন প্রক্রিয়া প্রকৃতির উপর কী প্রভাব ফেলছে, তা পরিমাপ করার প্রয়োজনীয় উদ্যোগ তাদের অধিকাংশই নিচ্ছে না। আর যারা এই প্রভাব পরিমাপ করছে, তাদের অনেকেই নির্ভর করছে মাত্র একটি সূচকের উপর। ফলে প্রকৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশের ক্ষতি তাদের নজর এড়িয়ে যেতে পারে। লুন্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের নতুন সমীক্ষায় উঠে এসেছে এমনই উদ্বেগজনক চিত্র। গবেষণার বিবরণটি সবিস্তারে প্রকাশিত হয়েছে জার্নাল অব ক্লিনার প্রোডাকশান পত্রিকায়।

গবেষকেরা জীববৈচিত্র্যের উপর সবচেয়ে বেশি প্রভাবশালী ক্ষেত্রের ৮৯টি বৃহৎ সংস্থার স্থায়িত্ব-সংক্রান্ত প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করেছেন। এই সংস্থাগুলি খাদ্য, পানীয় ও তামাক, জ্বালানি ও খনি, পোশাক, রাসায়নিক এবং নির্মাণশিল্পের সঙ্গে যুক্ত। তাদের উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থার কারণে প্রাকৃতিক বাসস্থান ধ্বংস, ভূমির ব্যবহার পরিবর্তন এবং বিভিন্ন প্রজাতির সংখ্যা হ্রাসের আশঙ্কা রয়েছে। কিন্তু সমীক্ষায় দেখা গেছে, ৮৯টি সংস্থার মধ্যে মাত্র আটটি অর্থাৎ, প্রায় ৯ শতাংশ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে জীববৈচিত্র্যের যেকোনো একক সূচক ব্যবহার করে। একাধিক সূচক ব্যবহার করে মাত্র দুটি সংস্থা।

সমস্যার মূল কারণ, জীববৈচিত্র্যকে একটি মাত্র সংখ্যায় প্রকাশ করা যায় না। এর কারণ, একই প্রজাতির জিন বৈচিত্র্য, বিভিন্ন প্রজাতির বৈচিত্র্য এবং বাস্তুতন্ত্রের বৈচিত্র্য। গবেষকেরা স্থলভাগের বিস্তৃত ভৌগোলিক তথ্য ব্যবহার করে চারটি সূচক বিশ্লেষণ করেছেন। এর মধ্যে দুটি বাস্তুতন্ত্রের অখণ্ডতা ও প্রাকৃতিক অবস্থা পরিমাপ করে। আর অন্য দুটি যথাক্রমে বিপন্ন প্রজাতির গুরুত্ব এবং কোনও অঞ্চলে প্রজাতির সমৃদ্ধি নির্ণয় করে।

দেখা গেছে, সূচকগুলির ফলাফল অনেক ক্ষেত্রেই পরস্পরের সঙ্গে মেলে না। যে অঞ্চল একটি সূচকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে চিহ্নিত হয়, অন্য সূচকে সেটিই কম গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হতে পারে। ফলে কোনও সংস্থা একটি মাত্র সূচকের ভিত্তিতে কাঁচামাল সংগ্রহ বা উৎপাদনের স্থান বেছে নিলে মূল্যবান প্রাকৃতিক বাসস্থান রক্ষার বিষয়টি উপেক্ষিত থেকে যেতে পারে।

এই বিপদ ভবিষ্যতে আরও প্রকট হওয়ার সম্ভাবনা। গবেষকদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে কৃষির সম্প্রসারণের কারণে বিশ্বের প্রায় ৩ শতাংশ স্থলভাগে, প্রাকৃতিক বন কাটার কারণে ৫ শতাংশ অঞ্চলে এবং নগরায়ণের ফলে ০.৫ শতাংশ স্থলভাগে উচ্চ হারে বাসস্থান ধ্বংসের আশঙ্কা রয়েছে। ৮৪৬টি স্থলজ বাস্তু-অঞ্চলের মধ্যে ৩৩টিতে জীববৈচিত্র্যের বিভিন্ন সূচকের সম্মিলিত গুরুত্বের অর্ধেকেরও বেশি এমন এলাকায় কেন্দ্রীভূত, যেখানে ২০৫০ সালের মধ্যে ব্যাপক বাসস্থান ধ্বংসের আশঙ্কা রয়েছে। এর মধ্যে দশটি অঞ্চলে এই অনুপাত ৮০ শতাংশ বা তার বেশি। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ক্রান্তীয় অঞ্চলে কৃষির সম্প্রসারণ ও অরণ্যচ্ছেদনই প্রধান বিপদ।

গবেষকেরা তাই একাধিক সূচক ব্যবহার, স্থানীয় বাস্তু-অঞ্চলভিত্তিক মূল্যায়ন এবং তথ্যের সীমাবদ্ধতাকে বিবেচনার মধ্যে আনার পরামর্শ দিয়েছেন। একাধিক সূচকের গড় নিয়ে একটি মাত্র যৌগিক স্কোর তৈরি করলেও কিন্তু কিছু গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আড়াল হতে পারে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের কর্পোরেট স্থায়িত্ব-প্রতিবেদন সংক্রান্ত নির্দেশিকা এবং গ্লোবাল রিপোর্টিং ইনিশিয়েটিভের নতুন মানদণ্ডের ফলে সংস্থাগুলির উপর জীববৈচিত্র্য-সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশের চাপ বাড়ছে। ২০২৩ সালের প্রতিবেদনে কোনও সংস্থাই সূচক ব্যবহারের কথা জানায়নি; ২০২৪ সালে এই হার ছিল ৪ শতাংশ, আর ২০২৫ সালে বেড়ে হয়েছে ১৮ শতাংশ।

গবেষকদের মতানুসারে, পরিমাপ বাড়লেই প্রকৃতির সুরক্ষা নিশ্চিত হয় না। সঠিকভাবে এবং একাধিক সূচকের সাহায্যে জীববৈচিত্র্যের মূল্যায়নই হল আসল উপায়।

সূত্র: The study is published in the Journal of Cleaner Production.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

19 + 7 =