“জীবাণু সাফাই হার”- ধারণার উদ্গাতা নিকোলাস হোয়াইট 

“জীবাণু সাফাই হার”- ধারণার উদ্গাতা নিকোলাস হোয়াইট 

সুপর্ণা চট্টোপাধ্যায়
বিজ্ঞানভাষ সম্পাদকীয় বিভাগ
Posted on ৯ মে, ২০২৬

চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে এমন কিছু মানুষ আছেন, যাঁদের কাজ নিঃশব্দে বিপ্লব ঘটায়। নিকোলাস হোয়াইট (১৯৫১-২০২৬) তেমনই এক নাম। সংক্রামক রোগের চিকিৎসায় তাঁর কাজ শুধু নতুন ওষুধ আবিষ্কারের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি বদলে দিয়েছিলেন, ওষুধের কার্যকারিতা সম্পর্কে প্রচলিত ধারণাই। ১৯৫১ সালে তাঁর জন্ম হয় যুক্তরাজ্যে। ছোটবেলা থেকেই বিজ্ঞান ও চিকিৎসার প্রতি আকর্ষণ তাঁকে ডাক্তারি পড়তে এবং সংক্রামক রোগ নিয়ে কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করে। পড়াশোনা শেষ করে তিনি খুব দ্রুতই বুঝতে পারেন, তাঁর কাজ শুধু উন্নত দেশের হাসপাতালেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। বরং যেখানে রোগের প্রকোপ বেশি, সেখানেই তাঁর প্রয়োজন বেশি। এই ভাবনা থেকেই তিনি জীবনের বড় অংশ কাটান দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়, বিশেষ করে থাইল্যান্ডের দুর্গম ও সীমান্তবর্তী এলাকায় কাজ করে।

 

ম্যালেরিয়া বহু বছর ধরেই বিশ্বের অন্যতম প্রাণঘাতী রোগ, বিশেষ করে আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়ায়। নিক-এর গল্প শুরু হয় কৌতূহল দিয়ে। এক সময় এই রোগের প্রধান চিকিৎসা ছিল কুইনাইন। কিন্তু এর সীমাবদ্ধতা ছিল, আর ধীরে ধীরে ওষুধ প্রতিরোধও বাড়ছিল। ১৯৭০-এর দশকের শেষদিকে, যখন ম্যালেরিয়া চিকিৎসায় পুরনো ওষুধ আর কাজ করছিল না, তখন চীনে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্র তাঁর চোখে পড়ে। তিনি দেখেন, এক ধরনের ভেষজ থেকে তৈরি ওষুধ ম্যালেরিয়া সারাতে পারে কোনো বড় পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছাড়াই। তিনি নিজে চীনে যান, গবেষকদের সঙ্গে দেখা করেন, আর সেই ওষুধের নমুনা নিয়ে ফিরে আসেন নিজের ল্যাবে। এই কৌতূহলই পরে বদলে দেয় বিশ্বের ম্যালেরিয়া চিকিৎসার ইতিহাস।

 

১৯৮০ সালে থাইল্যান্ডে তিনি গড়ে তোলেন মাহিদল অক্সফোর্ড ট্রপিক্যাল মেডিসিন রিসার্চ ইউনিট —যা পরে হয়ে ওঠে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংক্রামক রোগ গবেষণা কেন্দ্র। এখানে শুধু গবেষণা নয়, স্থানীয় চিকিৎসক, নার্স, বিজ্ঞানীদের সঙ্গে মিলে তিনি তৈরি করেছিলেন এক সহযোগিতার নেটওয়ার্ক। তাঁর কাছে গবেষণা মানে শুধু পেপার প্রকাশ করা নয় , রোগীর জীবনে বাস্তব পরিবর্তন আনাই ছিল মূল লক্ষ্য। নিক-এর কাজের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে এই ম্যালেরিয়ার চিকিৎসায়। তাঁর দল সামনে আনে আর্টেমিসিনিন-ভিত্তিক যৌথ চিকিৎসা। তাঁদের গবেষণা দেখায়, কুইনাইনের তুলনায় অনেক দ্রুত পরজীবী ধ্বংস করে এই আর্টেসুনেট, সরাসরি রোগীর বাঁচার সম্ভাবনা বাড়ায়। এটিই বর্তমানে বিশ্বজুড়ে ম্যালেরিয়া চিকিৎসার সবচেয়ে কার্যকর ও ব্যবহৃত পদ্ধতি। সহজভাবে বললে, এই পদ্ধতির মানে একসঙ্গে দু ধরনের ওষুধ ব্যবহার করা। যথা-

ক. আর্টেমিসিনিন: আর্টেমিসিনিন জনিত ওষুধগুলি অত্যন্ত দ্রুত হারে ম্যালেরিয়া পরজীবীর সংখ্যা কমিয়ে দেয়। ফলে রোগ দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আসে।

এবং খ. সঙ্গী ওষুধ: এরা বাকি পরজীবীগুলোকে ধীরে ধীরে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে। এই ‘দ্বৈত আঘাত’-এর কারণে রোগটি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আসে এবং পুনরায় সংক্রমণের ঝুঁকিও কমে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০০৬ সালে ম্যালেরিয়ার এই চিকিৎসাকে বিশ্বজুড়ে সুপারিশ করে। তার ফলে লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন বাঁচে। আরও গুরুতর ম্যালেরিয়ার ক্ষেত্রে আরেকটি যুগান্তকারী পরিবর্তন আসে আর্টেমিসিনিন ব্যবহারের মাধ্যমেই। আগের তুলনায় এটি মৃত্যুহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দেয়। নিক আগেই সতর্ক করেছিলেন, যদি ম্যালেরিয়ার পরজীবীর সংখ্যা কমতে বেশি সময় লাগে, তবে সেটি আর্টেমিসিনিন প্রতিরোধের লক্ষণ হতে পারে। পরে এই ধারণা ঠিক প্রমাণিত হয় এবং রোগ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

 

নিক-এর কাজের সবচেয়ে অভিনব দিক ছিল, তিনি চিকিৎসাকে শুধু “ওষুধ কাজ করল কি না’’ দিয়ে বিচার করেননি। তিনি জানতে চেয়েছিলেন, “কত দ্রুত কাজ করছে?” এই প্রশ্ন থেকেই উঠে আসে “প্যাথোজেন ক্লিয়ারেন্স রেট’’-এর ধারণাটি। এই ধারণাটি প্রথমে ম্যালেরিয়ায় ব্যবহার হলেও পরে তা ছড়িয়ে পড়ে অন্যান্য রোগের ক্ষেত্রেও, যেমন ইনফ্লুয়েঞ্জা, ক্রিপ্টোকক্কাল মেনিনজাইটিস, এমনকি কোভিড-১৯। আসলে তাঁর বড় শক্তি ছিল, একটি ধারণাকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা। ইনফ্লুয়েঞ্জা শ্বাসতন্ত্রের একটি ভাইরাসজনিত সংক্রমণ। এ রোগে ভাইরাস শরীরে দ্রুত বাড়ে এবং কমেও। ভাইরাসের সংখ্যা কতটা দ্রুত কমছে, তাই দিয়ে বোঝা যায় ওষুধ কতটা কার্যকর। ছত্রাকজনিত মারাত্মক সংক্রমণ ক্রিপ্টোকক্কাল মেনিনজাইটিস, মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রকে আক্রমণ করে। তার সংক্রমণের চিকিৎসার সাফল্য অনেকটাই নির্ভর করে শরীর থেকে ছত্রাক কত দ্রুত সাফ হচ্ছে তার উপর। হালের অতিমারি কোভিড-১৯ -এও ভাইরাসের সংখ্যা শরীরে কত দ্রুত কমছে সেটা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাছাড়া যখন কোভিডের নতুন নতুন অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ পরীক্ষা করা হচ্ছিল, তখন অনেক গবেষণাই বিভ্রান্তিকর ফল দিচ্ছিল। কারণ সেই পুরনো সমস্যা “টাইম টু ক্লিয়ারেন্স’’ যথেষ্ট সংবেদনশীল ছিল না। সেখানেও নিক ও তাঁর সহকর্মীরা দেখান, যদি ভাইরাসের সংখ্যা কমার হার মাপা যায়, তাহলে অনেক দ্রুত ও নির্ভুলভাবে বোঝা যাবে কোন ওষুধ কার্যকর। অর্থাৎ, রোগ ভিন্ন হলেও একটি সাধারণ সূত্র কাজ করে – জীবাণুর সংখ্যা যত দ্রুত কমবে, রোগীর সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনাও তত বাড়বে।

নিক-এর কাজের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল, গণিতের ব্যবহার। তিনি অবশ্য খুব জটিল মডেল ব্যবহার করেননি। বরং সহজ সমীকরণ দিয়ে দেখিয়েছেন, কীভাবে জীবাণুর সংখ্যা সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়। যেমন, প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট হারে জীবাণুর সংখ্যা কমছে। এই হারটাই বলে দেয়, ওষুধ কতটা কার্যকর। এই পদ্ধতির ভিত্তি গড়ে উঠেছে আগের গবেষণা থেকেই। উদাহরণস্বরূপ, মেটাবলিক রেট থিওরি দেখায়, শরীরের শক্তি ব্যবহারের হার একটি নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে চলে। নিক সেই ধরনের সাধারণ নিয়মকেই সংক্রামক রোগের ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করেন। তিনি প্রায়ই একটি বিখ্যাত উক্তির কথা বলতেন, “সব মডেলই ভুল, তবে কিছু মডেল কাজে লাগে।‘’এই কথাটি পরিসংখ্যানবিদ জর্জ বক্স-এর। এই দর্শনই নিক -এর ভিত্তি। তিনি জানতেন, বাস্তব জীবন অনেক জটিল। একটি মডেল কখনও পুরো বাস্তবকে ধরতে পারে না। কিন্তু যদি সেই মডেল চিকিৎসায় সাহায্য করে, রোগী বাঁচায় তাহলেই তার মূল্য রয়েছে।

 

তাছাড়া তাঁকে আলাদা করে তুলেছিল তাঁর মানবিকতা। তিনি শুধু ল্যাবে বসে গবেষণা করেননি। তিনি শরণার্থী শিবিরে গিয়েছেন, প্রত্যন্ত অঞ্চলে কাজ করেছেন, স্থানীয় মানুষের সঙ্গে থেকেছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, “গবেষণা তখনই অর্থবহ, যখন তা মানুষের কাজে লাগে।‘’ ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন খুবই বিনয়ী এবং সংযত মানুষ। সহকর্মীদের কাছে তিনি শুধু একজন বড় বিজ্ঞানী নন, বরং একজন শিক্ষক ও পথপ্রদর্শক ছিলেন। তরুণ গবেষকদের তিনি সবসময় উৎসাহ দিতেন, প্রশ্ন করতে শিখিয়েছেন, এবং বাস্তব সমস্যার দিকে নজর দিতে বলেছেন।

 

আজ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা সংক্রামক রোগের চিকিৎসায় সিপাই হার বা ক্লিয়ারেন্স রেটের মতো ধারণা ব্যবহার করছে। নতুন ওষুধ পরীক্ষায়, ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে, এমনকি মহামারি মোকাবিলায়ও এই পদ্ধতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ২০২৪ সালে ম্যানচেস্টারে অনুষ্ঠিত থিও মারফি মিটিং-এ বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন রোগের জন্য একই ধরনের গণিতভিত্তিক কাঠামো ব্যবহারের ওপর জোর দেন। এই আলোচনার কেন্দ্রেও ছিল নিক-এর চিন্তাভাবনা। আজ প্রশ্ন উঠছে, তাঁর এই মডেল কি আরও উন্নত করা যায়? কোনো কোনো প্রজাতি বা জীবাণু কি এই নিয়ম ভাঙতে পারে? গবেষকরা এখন খুঁজছেন এমন ব্যতিক্রম, যেখানে জীবাণু অস্বাভাবিক ধীরে বা অস্বাভাবিক দ্রুত কমে। এই ব্যতিক্রমগুলোই হয়তো ভবিষ্যতের নতুন চিকিৎসা পদ্ধতির পথ দেখাবে। একই সঙ্গে, ডেটা সায়েন্স ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে আরও বড় ডেটাসেট বিশ্লেষণ করা সম্ভব হচ্ছে, যা এই ক্ষেত্রটিকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাবে। নিক-এর কাজ আমাদের একটি বড় শিক্ষা দেয়- বিজ্ঞানকে সবসময় জটিল হতে হবে না। একটি সহজ প্রশ্ন : “কত দ্রুত?”- এই দিয়েই তিনি চিকিৎসাবিজ্ঞানের এক নতুন দিক খুলে দিয়েছেন। ম্যালেরিয়া থেকে কোভিড- বিভিন্ন রোগে তাঁর ধারণা লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন বাঁচাতে সাহায্য করেছে। হয়তো তাঁর মডেল নিখুঁত নয়, কিন্তু বাস্তবে তার প্রভাব গভীর। সংখ্যা, সমীকরণ আর বাস্তব জীবনের এই মেলবন্ধনই দেখায়, বিজ্ঞান শেষ পর্যন্ত মানুষের জন্যই। ২০২৬ সালের ১ ফেব্রুয়ারি ৭৪ বছর বয়সে তিনি প্রয়াত হন। ইংল্যান্ডের অক্সফোর্ডে ক্যান্সারের একটি জোরালো ধরনের চিকিৎসা চলাকালীন তাঁর মৃত্যু হয়। জীবনের শেষ সময় পর্যন্তও তিনি থেমে থাকেননি। মৃত্যুর ঠিক আগের মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের কাজে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। এ তাঁর অসামান্য নিষ্ঠা ও বিজ্ঞানচর্চার প্রতি গভীর অঙ্গীকারেরই প্রমাণ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

five × three =