জোড়া কৃষ্ণগহ্বর তৈরির রহস্য

জোড়া কৃষ্ণগহ্বর তৈরির রহস্য

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ৬ আগষ্ট, ২০২৬

দুই কৃষ্ণগহ্বরের সংঘর্ষ থেকে সৃষ্ট মহাকর্ষ তরঙ্গ প্রথম শনাক্ত হয় ২০১৫ সালে।সেই ঐতিহাসিক আবিষ্কার জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞানে নতুন যুগের সূচনা করলেও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর কিন্তু অধরাই থেকে যায় : কৃষ্ণগহ্বরের এই জুটিগুলি ঠিক কীভাবে তৈরি হয়? এক দশক পর সেই রহস্যের সমাধানের পথে বড় অগ্রগতির ইঙ্গিত মিলেছে। সাম্প্রতিক একাধিক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, কৃষ্ণগহ্বরের জুটি একটিমাত্র নয়, অন্তত তিনটি ভিন্ন প্রক্রিয়ায় গঠিত হয়।যুক্তরাষ্ট্রের লেজার ইন্টারফেরোমিটার মহাকর্ষীয়-তরঙ্গ মানমন্দির(এলআইজিও), ইতালির ভিরগো এবং জাপানের কাগরা মহাকর্ষীয় তরঙ্গ পর্যবেক্ষণাগার এখন পর্যন্ত ৩০০-রও বেশি কৃষ্ণগহ্বরের সংঘর্ষ শনাক্ত করেছে।এই বিপুল তথ্যভাণ্ডারের পরিসংখ্যানগত বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা কৃষ্ণগহ্বরের উৎপত্তি সম্পর্কে এক নতুন ধারণায় পৌঁছেছেন।কৃষ্ণগহ্বর হলো বিশাল ভরের কোনো নক্ষত্রের জীবনাবসানের পর তার কেন্দ্র ধসে পড়ে তৈরি হওয়া অত্যন্ত শক্তিশালী মহাকর্ষীয় অঞ্চল।দুটি কৃষ্ণগহ্বর একে অপরকে প্রদক্ষিণ করতে করতে শেষ পর্যন্ত সংঘর্ষে লিপ্ত হলে মহাকাশে মহাকর্ষ তরঙ্গ সৃষ্টি হয়। এই তরঙ্গ মহাকাশ-সময়ের সূক্ষ্ম কম্পন হিসেবে ছড়িয়ে পড়ে, যাকে এলআইজিও, ভিরগো ও কাগরার মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল যন্ত্র শনাক্ত করতে পারে।গবেষকদের মতে, কৃষ্ণগহ্বরের জুটি তৈরির প্রথম উপায়টি হলো একই গ্যাসমেঘ থেকে জাত দুটি নক্ষত্রের যৌথ বিবর্তন।এই নক্ষত্রদ্বয় দীর্ঘ সময় ধরে পরস্পরকে প্রদক্ষিণ করতে করতে শেষে কৃষ্ণগহ্বরে পরিণত হয় এবং একসময় একে অপরের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়।কম ভরের কৃষ্ণগহ্বরের জুটির ক্ষেত্রে এই প্রক্রিয়াই সবচেয়ে সম্ভাব্য বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা।দ্বিতীয় প্রক্রিয়াটি ঘটে ঘন নক্ষত্রপুঞ্জে।সেখানে পৃথকভাবে গঠিত কৃষ্ণগহ্বরগুলো মহাকর্ষ টানের ফলে একে অপরের কাছাকাছি এসে জুটি বাঁধে।এই ধরনের জুটিতে সাধারণত দুটি কৃষ্ণগহ্বরের ভর প্রায় সমান হয় এবং তাদের ঘূর্ণনের দিক এলোমেলো থাকে।মাঝারি ভরের কৃষ্ণগহ্বরের ক্ষেত্রেই এই প্রক্রিয়ার প্রমাণ সবচেয়ে বেশি মিলেছে।সবচেয়ে আকর্ষণীয় তৃতীয় প্রক্রিয়াটি হলো ধারাবাহিক সংযুক্তি।এতে একটি কৃষ্ণগহ্বর নিজেই আগে দুটি কৃষ্ণগহ্বরের সংঘর্ষ থেকে তৈরি হয়।পরে সেই বৃহৎ কৃষ্ণগহ্বর আবার আরেকটি কৃষ্ণগহ্বরের সঙ্গে মিলিত হয়।ফলে তার ভর ও ঘূর্ণনের গতি অনেক বেশি হয়।গবেষণায় দেখা গেছে, সবচেয়ে ভারী কৃষ্ণগহ্বরের জুটিগুলির বৈশিষ্ট্য এই ধারাবাহিক সংযুক্তির সঙ্গেই সবচেয়ে বেশি মেলে।এই সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে বিজ্ঞানীরা কৃষ্ণগহ্বরের ঘূর্ণনের দিক, ঘূর্ণনের গতি এবং ভরের অনুপাত বিশ্লেষণ করেছেন।আগে ধারণা ছিল, একটি মাত্র প্রক্রিয়াই অধিকাংশ কৃষ্ণগহ্বরের জুটি তৈরি করে।কিন্তু নতুন পরিসংখ্যানগত বিশ্লেষণ সেই ধারণা বদলে দিয়েছে।এখন গবেষকেরা মনে করছেন, মহাবিশ্বে বিভিন্ন পরিবেশে ভিন্ন ভিন্ন উপায়ে কৃষ্ণগহ্বরের জুটি সৃষ্টি হয়।তবে বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলেছেন, এখন পর্যন্ত মাত্র ৩০০-র কিছু বেশি সংঘর্ষের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। তাই এই সিদ্ধান্ত এখনও প্রাথমিক।ভবিষ্যতে আরও বেশি মহাকর্ষ তরঙ্গ শনাক্ত হলে এবং আরও উন্নত পর্যবেক্ষণাগার চালু হলে কৃষ্ণগহ্বরের উৎপত্তি সম্পর্কে আরও নির্ভুল ধারণা পাওয়া যাবে।পাশাপাশি বিশাল ভরের নক্ষত্র, যুগ্ম নক্ষত্র, নক্ষত্রপুঞ্জ এবং সুপারনোভা বিস্ফোরণ নিয়ে বিস্তৃততর পর্যবেক্ষণও এই গবেষণাকে সমৃদ্ধ করবে। গবেষকদের মতে, কৃষ্ণগহ্বরের জুটিগুলি যদি সত্যিই একাধিক উপায়ে তৈরি হয়ে থাকে, তাহলে তাদের সংঘর্ষ কেবল একটি মহাজাগতিক ঘটনা নয়; বরং তা হয়ে উঠতে পারে মহাবিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চল, নক্ষত্রের বিবর্তন এবং চরম মহাকর্ষ পরিবেশ সম্পর্কে জানার এক অনন্য জানালা । নতুন এই আবিষ্কার মহাকর্ষ তরঙ্গ গবেষণাকে আরও সমৃদ্ধ করবে এবং মহাবিশ্বের অজানা অধ্যায় উন্মোচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে ।

 

doi: 10.1126/science.zp32iy3

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

twenty − 16 =