টিউমারের ভেতরেই পাল্টা আঘাত

টিউমারের ভেতরেই পাল্টা আঘাত

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১০ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬

ক্যানসার মানেই যেন এক নিঃশব্দ গৃহযুদ্ধ। শরীরের নিজস্ব প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ইমিউন সেল, জানে শত্রু কে, জানে কিভাবে আক্রমণ করতে হয়, তবু টিউমারের ভেতরে ঢুকে তারা হয়ে পড়ে প্রায় নিষ্ক্রিয়। বিশেষ করে ম্যাক্রোফেজ নামের ইমিউন কোষগুলো, যাদের কাজই হলো অনুপ্রবেশকারীকে গিলে ফেলা, ক্যানসারের ঘন অন্ধকারে ঢুকে তারা নিজের ভূমিকা ভুলে যায়। টিউমার তাদের দমন করে, দিকভ্রান্ত করে, কার্যত ব্যবহার করে নিজের সুরক্ষাকবচ হিসেবে। এই জায়গাটিতেই ক্যানসার চিকিৎসার বড় ব্যর্থতা। ইমিউনোথেরাপি যুগান্তকারী হলেও, সলিড টিউমার, যেমন- পাকস্থলী, ফুসফুস বা যকৃতের ক্যানসার একেবারে আলাদা সমস্যা। এগুলো ঘন, শক্ত। ইমিউন কোষ ঢোকার পক্ষে এগুলি প্রায় অপ্রবেশ্য দুর্গ। ফলে অনেক আধুনিক থেরাপি রক্তের ক্যানসারে কাজ করলেও, সলিড টিউমারের সামনে এসে থেমে যায়। এই অচলাবস্থার মধ্যেই দক্ষিণ কোরিয়ার KAIST (Korea Advanced Institute of Science and Technology) থেকে এসেছে এক দুঃসাহসী ধারণা। ইমিউন কোষকে বাইরে থেকে তৈরি করে ঢোকানো নয়, বরং টিউমারের ভেতরেই শরীরের নিজস্ব কোষকে ক্যানসার-হন্তায় রূপান্তরিত করা। KAIST-এর বায়ো ও ব্রেন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক জি-হো পার্কের নেতৃত্বে এক গবেষক দল এমন একটি থেরাপি তৈরি করেছেন, যা সরাসরি টিউমারের ভেতরে কাজ করে। এই চিকিৎসা পদ্ধতিতে কোনো ইমিউন কোষকে শরীরের বাইরে এনে ল্যাবে পাল্টে আবার ঢোকানোর ঝামেলা নেই। বরং টিউমারের আশপাশে আগে থেকেই থাকা ম্যাক্রোফেজগুলোই হয়ে ওঠে চিকিৎসার বাহক। পদ্ধতিটি শুনতে প্রায় কল্পবিজ্ঞানের মতো। গবেষকেরা তৈরি করেছেন বিশেষ লিপিড ন্যানোপার্টিকল বা চর্বি-জাতীয় অতি ক্ষুদ্র বাহক। যেগুলোকে ম্যাক্রোফেজ খুব সহজে শোষণ করে নিতে পারে। এই ন্যানোপার্টিকলের ভেতরে থাকে দুটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। একদিকে mRNA, যা ক্যানসার-সনাক্তকারী CAR (Chimeric Antigen Receptor) প্রোটিন তৈরির নির্দেশ বহন করে। অন্যদিকে থাকে একটি ইমিউন-উদ্দীপক উপাদান, যা কোষের প্রতিরক্ষা সংকেতকে জাগিয়ে তোলে। ফলাফল? ম্যাক্রোফেজ নিজেই নিজের ভেতরে CAR প্রোটিন তৈরি করতে শুরু করে এবং রূপান্তরিত হয় তথাকথিত CAR-macrophage নামক একটি সক্রিয়, আক্রমণাত্মক ক্যানসার-বিধ্বংসী কোষে। CAR-macrophage নিয়ে আগেও গবেষণা হয়েছে, এবং এগুলোকে ভবিষ্যতের ইমিউনোথেরাপি হিসেবে দেখা হয়। কারণ ম্যাক্রোফেজ কেবল ক্যানসার কোষকে গিলে ফেলে না, পাশের ইমিউন কোষগুলোকেও সক্রিয় করে তোলে। কিন্তু এতদিন এই থেরাপির সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল এর জটিলতা। রোগীর শরীর থেকে কোষ সংগ্রহ, ল্যাবে জেনেটিক পরিবর্তন, সময়সাপেক্ষ উৎপাদন, এবং বিপুল খরচ। কিন্তু এই গবেষণা, এহেন গোটা প্রক্রিয়াকেই কার্যত অপ্রয়োজনীয় করে দিয়েছে। প্রাণী পরীক্ষায় দেখা গেছে, বিশেষত মেলানোমা, অর্থাৎ ত্বকের সবচেয়ে মারাত্মক ক্যানসারে এই থেরাপি টিউমারের বৃদ্ধি উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দেয়। শুধু তাই নয়, গবেষকেরা লক্ষ করেছেন যে ইমিউন প্রতিক্রিয়া কেবল ইনজেকশন দেওয়া টিউমারেই সীমাবদ্ধ থাকে না। শরীরের অন্য অংশেও প্রতিরোধ গড়ে ওঠার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। অর্থাৎ, স্থানীয় আক্রমণ থেকে শুরু করে সম্ভাব্য সিস্টেম ঘটিত ইমিউন সুরক্ষা লাভ। অধ্যাপক জি-হো পার্কের ভাষায়, “এই গবেষণা ইমিউন সেল থেরাপির একেবারে নতুন এক ধারণা তুলে ধরেছে : রোগীর শরীরের ভেতরেই অ্যান্টিক্যানসার কোষ তৈরি করা।”তিনি আরও বলেন, এই পদ্ধতি একসঙ্গে CAR-macrophage থেরাপির দুটি বড় বাধা ভেঙে দিয়েছে: ডেলিভারি সমস্যা এবং টিউমারের ইমিউন-দমনকারী পরিবেশ। সুতরাং, হয়তো এই প্রথমবার ক্যানসার চিকিৎসার ক্ষেত্রে, শত্রুর দুর্গ ভাঙতে বাইরে থেকে সেনার প্রয়োজন হবে না, বরং ভেতরের বিদ্রোহী কোষগুলিই হবে আসল খিলাড়ি।

 

সূত্র: In Situ Chimeric Antigen Receptor Macrophage Therapy via Co-Delivery of mRNA and Immunostimulant. ACS Nano, 2025

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

five × two =