মনুষ্য সমাজে নাম সামাজিক সম্পর্কের ভিত্তি। কিন্তু মানুষ ছাড়া অন্য কোনো প্রাণী কি সত্যিই একে অপরকে নাম ধরে ডাকতে পারে? বহুদিনের এই কৌতূহল নিবৃত্ত করতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা এবার টিয়াপাখিদের আচরণে খুঁজে পেলেন কিছু চাঞ্চল্যকর ইঙ্গিত। খুব সম্প্রতি এক গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু টিয়া নির্দিষ্ট মানুষ বা প্রাণীকে আলাদা করে শনাক্ত করতে তাদের নামের মতো শব্দ ব্যবহার করতে পারে।
গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন ইউনিভার্সিটি অব নর্দার্ন কলোরাডোর জীববিজ্ঞানী লরিন বেনেডিক্ট এবং ইউনিভার্সিটি অব পিটসবার্গ অ্যাট জনস্টাউনের গবেষক ক্রিস্টিন ডালিন। তাঁদের সঙ্গে ছিলেন অস্ট্রিয়ার একদল গবেষক। সাধারণত এ ধরনের গবেষণায় বিজ্ঞানীরা বন্য পরিবেশে প্রাণীদের ডাক বিশ্লেষণ করেন। কিন্তু এবার গবেষকেরা বেছে নেন মানুষের পোষা টিয়াপাখিদের, কারণ তাদের মানুষের ভাষা অনুকরণ করার অসাধারণ ক্ষমতা আছে।
গবেষণায় প্রায় ৮৮৯টি টিয়াপাখির জরিপ-তথ্য ও শত শত অডিও রেকর্ড বিশ্লেষণ করা হয়। এর মধ্যে ৪১৩টি অডিও ক্লিপ বিশেষভাবে পরীক্ষা করে গবেষকেরা দেখতে পান, অন্তত ৮৮টি ক্ষেত্রে টিয়ারা এমনভাবে নাম উচ্চারণ করেছে, যা নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তি বা প্রাণীকে বোঝানোর ইঙ্গিত দেয়। অর্থাৎ, তারা শুধু মানুষ বা পাখি জাতীয় সাধারণ পরিচয় ব্যবহার করেনি; আলাদা ব্যক্তিকে আলাদা শব্দের মাধ্যমে শনাক্ত করেছে।
এই আচরণ বিজ্ঞানীদের বিশেষভাবে আকৃষ্ট করেছে, কারণ মানুষের সমাজেও নাম ব্যবহারের প্রধান উদ্দেশ্য হলো জটিল সামাজিক সম্পর্ককে সহজভাবে সংগঠিত করা। গবেষকদের ধারণা, টিয়াপাখিদের মধ্যেও হয়তো সামাজিক যোগাযোগের জন্য একই ধরনের প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়েছে।
তবে গবেষণায় আরও একটি অদ্ভুত দিক উঠে এসেছে। অনেক টিয়া মানুষের মতো নিয়ম মেনে নাম ব্যবহার করেনি। কিছু পাখি নিজের নাম নিজেই বারবার বলে মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা করছে। আবার কিছু ক্ষেত্রে তারা এমন কারও নাম উচ্চারণ করেছে, যে তখন সেখানে উপস্থিতই ছিল না। এসব আচরণ ইঙ্গিত দেয়, টিয়াদের যোগাযোগ শুধু শব্দ অনুকরণ নয়; এর পেছনে স্মৃতি, সামাজিক বোধ এবং মানসিক প্রক্রিয়ারও ভূমিকা থাকতে পারে। গবেষক ক্রিস্টিন ডালিনের মতে, প্রাণীদের এই সংকেতকে সরাসরি মানুষের ভাষার নাম বলে ঘোষণা করা এখনই সম্ভব নয়। কারণ আমরা এখনও নিশ্চিতভাবে জানি না, তারা কোন উদ্দেশ্যে এই শব্দগুলো ব্যবহার করে। তবে একটা বিষয় স্পষ্ট যে, টিয়াপাখিদের বোধবুদ্ধিগত ক্ষমতা আমাদের ধারণার চেয়ে অনেক বেশি জটিল।
এই আবিষ্কার প্রাণীজগতের ভাষা ও বুদ্ধিমত্তা নিয়ে গবেষণার একটা নতুন দিক। মানুষের কাছে টিয়াপাখি হল কথা নকল করা প্রাণী। কিন্তু নতুন এই গবেষণা দেখিয়ে দিল, তাদের হয়তো শব্দ অনুকরণের পাশাপাশি সামাজিক সম্পর্ক বোঝা ও নির্দিষ্ট পরিচয় স্মরণ রাখার মতো উন্নত মানসিক দক্ষতাও ধারণ করে।
সূত্র: “Name use by companion parrots” by Lauryn Benedict, Viktoria Groiss, Marisa Hoeschele, Eva Reinisch and Christine R. Dahlin, 17 April 2026, PLOS ONE.
DOI: 10.1371/journal.pone.0346830
