আমরা কেন বিজ্ঞানী হই? প্রধান কারণ অবশ্যই কৌতূহল। প্রাকৃতিক জগৎকে বোঝার আকাঙ্ক্ষা। আমরা জানি, এখনও অনেক কিছু অজানা, আর সেই অজানাকেই জানতে চায় বিজ্ঞান। তবে এর তলায় আরও একটি গভীর বিশ্বাস কাজ করে। “সত্য’’ বলে কিছু আছে – তাকে আবিষ্কার করা সম্ভব। বেশিরভাগ বিজ্ঞানীই (সচেতন বা অবচেতনভাবে) “বাস্তববাদী’’ বা রিয়ালিস্ট। অর্থাৎ, তারা বিশ্বাস করেন যে মানুষের চিন্তা, ভাষা বা উপলব্ধির বাইরে একটি বাস্তব জগৎ রয়েছে। আমরা ল্যাবরেটরিতে বা ক্ষেত্রে যা আবিষ্কার করি, সেগুলো আমাদের কল্পনার সৃষ্টি নয়। বিজ্ঞান আগে থেকেই যে-সত্য বিদ্যমান তাকে খুঁজে পাওয়া্র চেষ্টা করে। যেমন কোষ। এ তো আমরা মাইক্রোস্কোপে দেখার আগে থেকেই ছিল। যখন আমাদের রাসায়নিক বন্ধনের ধারণাও ছিল না, তখনও জটিল অণু একই ভাবে কাজ করত। একইভাবে, মহাকর্ষের শক্তি দূরত্বের বর্গের ব্যস্তানুপাতিক – এই নিয়ম আমরা জানার আগেই প্রকৃতিতে কাজ করত। পরবর্তীতে, আমরা বুধ গ্রহের অস্বাভাবিক কক্ষপথে বৃহৎ মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের কাছে এই একই নিয়মের ব্যতিক্রম ঘটতে দেখি। আলবার্ট আইনস্টাইন আপেক্ষিকতাবাদের মাধ্যমে তা ব্যাখ্যা করেন। প্রতি বছর আমাদের জ্ঞান বাড়ছে, এবং সেই সঙ্গে আমরা সত্যের কাছাকাছি পৌঁছাচ্ছি। এই অগ্রগতির মূল ভিত্তি হল, তথ্যের অবাধ আদান-প্রদান, এবং ধারণাগুলিকে প্রশ্ন করা, পরীক্ষা করা ও সমালোচনা করার সুযোগ থাকা। বিজ্ঞান তখনই এগোয়, যখন আমরা খোলা মনে আলোচনা করি এবং বাস্তবতার সঙ্গে আমাদের ব্যাখ্যার মিল কতটা, তা যাচাই করি।
কিন্তু “সত্য’’ ধারণাটি তো শুধু বিজ্ঞানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি সমাজ ও রাজনীতির ক্ষেত্রেও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে বিষয়টি বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। ধরুন, আমেরিকা-ইরান যুদ্ধ পরিস্থিতি। সেখানে প্রতিনিয়ত মার্কিন সরকার বা নেতৃত্ব ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা দিচ্ছে। যেমন, যুদ্ধ শেষ, আবার শুরু, অন্যদের সাহায্য দরকার, আবার দরকার নেই, অর্থনীতিতে প্রভাব পড়বে না, আবার পড়বে! এই ধরনের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য সত্য নির্ধারণকে কঠিন করে তোলে। ইতিহাস বলছে, রাজনীতিতে, বিশেষ করে যুদ্ধের সময় ‘সত্য’ প্রায়ই বিধ্বস্ত হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ট্রাম্প প্রশাসন এমন এক প্রবণতা দেখাচ্ছে যেখানে সত্য ও প্রমাণের চেয়ে আনুগত্য বা মতাদর্শকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। যেমন টিকা নীতিতে হঠাৎ পরিবর্তন, নবায়নযোগ্য শক্তি (যেমন- সৌর ও বায়ু শক্তি) প্রকল্প বাতিল করে জীবাশ্ম জ্বালানির দিকে ঝোঁক বাড়ানো, অথবা জলবায়ু পরিবর্তনকে অস্বীকার করা। একইভাবে, কিছু শাসনব্যবস্থা নিজেদের সুবিধামতো “সত্য’’তৈরি করে, যা তাদের ক্ষমতা ধরে রাখতে সাহায্য করে।
এমন পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়া কী হওয়া উচিত? আমরা যেন মিথ্যার বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে নিজেরাও মিথ্যার আশ্রয় না নিই। এই প্রসঙ্গে কবি উইলিয়াম ব্লেক-এর কথাটি উল্লেখযোগ্য। “মানুষ যা দেখে, ধীরে ধীরে তাই হয়ে ওঠে’’। আবার দার্শনিক ফ্রিডরিখ নিৎশে সতর্ক করেছিলেন, “দানবের সঙ্গে লড়তে গিয়ে নিজেই দানব হয়ে ওঠার ঝুঁকি থাকে”। অর্থাৎ, অন্যায় প্রতিরোধ করতে গিয়ে আমরা যেন একই অন্যায় পদ্ধতি ব্যবহার না করি। বিজ্ঞানে নীতি ব্যাপারটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিজ্ঞানীরা কখনও কখনও ভুল করতে পারেন, কিন্তু বিজ্ঞানের মূল আদর্শ হল, সততা ও সত্যের প্রতি অঙ্গীকার। তাই কঠিন সময়েও সত্যকে অস্বীকার করা বা বিকৃত করা মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়। বর্তমান পরিস্থিতিতে একজন বিজ্ঞানীর দায়িত্ব কী? সহজভাবে বলা যায়, যতটা সম্ভব সত্যকে তুলে ধরা। কোনো সরকার বা ক্ষমতাশালী গোষ্ঠী যদি দাবি করে যে একমাত্র তারাই সত্যটা জানে, এবং তাদের প্রশ্ন করা দেশদ্রোহিতা – তাহলে সেটি গণতন্ত্র ও যুক্তিবাদের পরিপন্থী। এই ধরনের দাবিকে স্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যান করা প্রয়োজন। কারণ বিজ্ঞান আমাদের শিখিয়েছে, সত্য কোনো একক ব্যক্তির বা প্রতিষ্ঠানের একচেটিয়া সম্পত্তি নয়। এটি অনুসন্ধান, পরীক্ষা ও আলোচনার মাধ্যমে ধীরে ধীরে উন্মোচিত হয়। সত্যের প্রতি অটল থাকাই আমাদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।
সূত্র: Chemistry World; March 2026
