ডঃ সৌম্যা স্বামীনাথন, এফ আর এস 

ডঃ সৌম্যা স্বামীনাথন, এফ আর এস 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ৬ জুন, ২০২৬

ভারতের অন্যতম বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ও চিকিৎসক সৌম্যা স্বামীনাথন আধুনিক জনস্বাস্থ্য গবেষণার জগতে এক স্মরণীয় নাম। শিশু বিশেষজ্ঞ, ক্লিনিক্যাল বিজ্ঞানী এবং আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্যনীতি বিশেষজ্ঞ হিসেবে বিশ্বজুড়ে খ্যাতি তাঁর । বিশেষ করে যক্ষ্মা, এইচআইভি এবং সংক্রামক রোগ নিয়ে তাঁর গবেষণা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গভীর প্রভাব ফেলেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান বিজ্ঞানী হিসেবে কাজ করার সময় তিনি কোভিড-১৯ মহামারির বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এ বছর ভারতের বিজ্ঞানচর্চার ইতিহাসে এক অনন্য ও গর্বের অধ্যায় রচনা করলেন সৌম্য স্বামীনাথন । তিনি রয়্যাল সোসাইটির ফেলো নির্বাচিত হন, যা বিজ্ঞান জগতের অন্যতম বড় সম্মান। তিনি দ্বিতীয় ভারতীয় নারী হিসেবে এই স্বীকৃতি অর্জন করেন। তাঁর বাবা অর্থাৎ এম.এস. স্বামীনাথন ১৯৭৩সালে রয়্যাল সোসাইটির ফেলো নির্বাচিত হয়েছিলেন। তাই বলা যায় তাঁরা ভারতের প্রথম পিতাপুত্রী জুটি হিসেবে এই সম্মান লাভ করলেন। চার শতাব্দীরও বেশি পুরোনো এই প্রতিষ্ঠান একসময় আইজ্যাক নিউটনের মতো কিংবদন্তি বিজ্ঞানীদের সঙ্গে যুক্ত ছিল। সেই একই সম্মানজনক তালিকায় স্থান পাওয়া যে কোনো বিজ্ঞানীর জন্য বিশাল অর্জন। রয়্যাল সোসাইটির ৪০০ বছরের ইতিহাসে মাত্র দ্বিতীয় ভারতীয় নারী বিজ্ঞানী হিসেবে এই সম্মান অর্জন করেছেন। তাঁর আগে এই স্বীকৃতি পেয়েছিলেন বিখ্যাত ভ্যাকসিন গবেষক গগনদীপ কাং।

সৌম্যা বর্তমানে ভারতের জাতীয় যক্ষ্মা নির্মূল কর্মসূচির প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করছেন। তাঁর লক্ষ্য হলো বিজ্ঞানসম্মত পরিকল্পনার মাধ্যমে ভারত থেকে টিবি নির্মূল করা। এর আগে তিনি ICMR এর মহাপরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর নেতৃত্বে ভারতে স্বাস্থ্য গবেষণা ও জনস্বাস্থ্য নীতিতে নতুন গতি আসে।

সৌম্যা স্বামীনাথনের জন্ম ১৯৫৯ সালের ২ মে ভারতের চেন্নাই শহরে। ইনি এমন এক পরিবারে বেড়ে ওঠেন, যেখানে শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সামাজিক দায়বদ্ধতাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হতো। তাঁর মা মীনা স্বামীনাথন ছিলেন শিশু শিক্ষা ও সমাজকল্যাণে নিবেদিত একজন সমাজকর্মী। আর তাঁর বাবা এম. এস. স্বামীনাথন ছিলেন ভারতের ‘সবুজ বিপ্লবের জনক’। ফলে ছোটবেলা থেকেই তিনি সমাজের কল্যাণে কাজ করার অনুপ্রেরণা পান। ব্যক্তিগত জীবনে সৌম্যা স্বামীনাথন একজন পরিবারপ্রেমী মানুষ। তাঁর স্বামী অজিত যাদব একজন অর্থোপেডিক সার্জন। তাঁদের দুই সন্তান রয়েছে।

 

ছোটবেলা থেকেই সৌম্যার বিজ্ঞান ও চিকিৎসাবিদ্যার প্রতি আগ্রহ ছিল প্রবল। প্রথমে তিনি প্রাণীবিদ্যা পড়ে পশুচিকিৎসক হতে চেয়েছিলেন। পুনের আর্মড ফোর্সেস মেডিক্যাল কলেজ থেকে এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জন করে পরে দিল্লির AIIMS থেকে শিশু চিকিৎসাবিদ্যায় এমডি সম্পন্ন করেন। চিকিৎসা শিক্ষার পর তিনি যুক্তরাষ্ট্রের লস এঞ্জেলসে চিলড্রেনস-এ নবজাতক ও শিশুদের ফুসফুসজনিত রোগ নিয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণ নেন। এই সময় থেকেই গবেষণার প্রতি তাঁর আগ্রহ আরও গভীর হয়।

কেরিয়ারের শুরুতে তিনি যুক্তরাজ্যের লিস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ে শিশুদের শ্বাসতন্ত্রজনিত রোগ নিয়ে গবেষণা করেন। পরে ভারতে ফিরে এসে তিনি চেন্নাইয়ের ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট ফর রিসার্চ ইন টিউবারকিউলোসিস-এ যোগ দেন। এখানেই তিনি যক্ষ্মা ও এইচআইভি নিয়ে বিস্তৃত গবেষণা শুরু করেন। তাঁর গবেষণার মূল লক্ষ্য ছিল দরিদ্র ও অবহেলিত মানুষের কাছে উন্নত চিকিৎসা পৌঁছে দেওয়া।

সৌম্যা স্বামীনাথন এবং তাঁর সহকর্মীরা প্রথমদিকেই যক্ষ্মা শনাক্ত করার জন্য আধুনিক মলিকুলার প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নেন। তিনি এমন কিছু গবেষণা পরিচালনা করেন যার মাধ্যমে গ্রামীণ ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কাছে সহজে যক্ষ্মা চিকিৎসা পৌঁছে দেওয়ার নতুন পদ্ধতি তৈরি হয়। তিনি “টিবি জিরো সিটি” প্রকল্পের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন, যার উদ্দেশ্য ছিল বিভিন্ন শহর থেকে ধীরে ধীরে যক্ষ্মা নির্মূল করা।

২০১৫ সালে তিনি ভারতের ICMR-এর মহাপরিচালক এবং স্বাস্থ্য গবেষণা বিভাগের সচিব হন। এই পদে থেকে তিনি প্রমাণভিত্তিক স্বাস্থ্যনীতি গড়ে তোলা, মেডিক্যাল গবেষণার মান উন্নত করা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর জোর দেন। তাঁর নেতৃত্বে ভারতের স্বাস্থ্য গবেষণা আরও আধুনিক ও কার্যকর হয়ে ওঠে।

২০১৭ সালে তিনি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক হিসেবে যোগ দেন। পরে ২০১৯ সালে তিনি সংস্থাটির প্রধান বিজ্ঞানী নিযুক্ত হন। কোভিড-১৯ মহামারির সময় তিনি নিয়মিত আন্তর্জাতিক সংবাদ সম্মেলনে অংশ নিয়ে মানুষকে বৈজ্ঞানিক তথ্য ও পরামর্শ দেন। ভাইরাসের নতুন ধরন শনাক্ত করতে জিনোম সিকোয়েন্সিং বাড়ানোর জন্যও তিনি বিভিন্ন দেশকে উৎসাহিত করেন। তাঁর শান্ত, স্পষ্ট এবং বিজ্ঞানভিত্তিক বক্তব্য বিশ্বজুড়ে মানুষের আস্থা অর্জন করে।

সৌম্যা স্বামীনাথনের গবেষণার মূল ক্ষেত্র হলো শিশু ও প্রাপ্তবয়স্কদের যক্ষ্মা, রোগের বিস্তার, পুষ্টির ভূমিকা এবং এইচআইভি-সংক্রান্ত স্বাস্থ্য সমস্যা। তিনি বরাবরই চেয়ে এসেছেন, উন্নত চিকিৎসা শুধু ধনী মানুষরাই কেন পাবে, একটা উচ্চমানের চিকিৎসা ব্যবস্থার সুবিধা পাওয়া সব মানুষের মৌলিক অধিকার হওয়া উচিত।

এরপর তিনি ICAR-এর মহাপরিচালক হলেন এবং চেন্নাইয়ে তাঁর পিতার নামে এম.এস স্বামীনাথন রিসার্চ ইন্সটিটিউট প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর অসামান্য অবদানের জন্য তিনি পদ্মশ্রী, পদ্মভূষণ, পদ্মবিভূষণ এবং ভারতের সর্বোচ্চ নাগরিক সম্মান ভারতরত্ন লাভ করেন।

সামগ্রিকভাবে, সৌম্য স্বামীনাথন এমনই একজন চিকিৎসক এবং এমনই এক বিজ্ঞানী, যিনি মানবতার কল্যাণে বিজ্ঞানকে ব্যবহার করেছেন। তাঁর কাজ প্রমাণ করে যে সঠিক গবেষণা, মানবিকতা এবং দৃঢ় নেতৃত্ব পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষের জীবন বদলে দিতে পারে।

 

সূত্র: Meet Soumya and MS Swaminathan: India’s first father-daughter duo to be awarded the Fellowship of Royal Society,TOI Lifestyle Desk , etimes.in , May 20, 2026, 09:25 IST.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

seven + 3 =