মিজ আর ন্যাট, অর্থাৎ ডাঁশ মশা মাছি আকারে অত্যন্ত ছোট হলেও এদের জীবনযাপন ও বিবর্তনের ইতিহাস বেশ চমকপ্রদ। দুটিই ডিপ্টেরা বা দুই-ডানাওয়ালা মাছির দলের অন্তর্ভুক্ত। ন্যাট মাছি কোনো নির্দিষ্ট একক পরিবার নয়; ছোট আকারের বিভিন্ন মাছিকে সাধারণভাবে ন্যাট বলা হয়। অন্যদিকে মিজ হলো প্রাচীন একদল মাছি, যাদের মধ্যে মশারাও পড়ে। ওয়েলকাম স্যাঙ্গার ইন্সটিটিউট-এর গবেষকেরা এই ক্ষুদ্র পতঙ্গগুলোর জিনোম বা সম্পূর্ণ DNA বিশ্লেষণ করে এদের বিবর্তন, প্রজনন ও জিনগত ৬টি বৈশিষ্ট্য উপস্থাপন করেছেন।
১) কিছু প্রাপ্তবয়স্ক মাছি একেবারেই খায় না। ফাঙ্গাস ন্যাট ও অনেক অদংশক মিজ প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর খাবার খাওয়া বন্ধ করে দেয়। লার্ভা অবস্থায় পচা জৈব পদার্থ খেয়ে তারা শক্তি জমিয়ে রাখে। প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর সেই সঞ্চিত শক্তি ব্যবহার করে অল্প সময়ের মধ্যেই সঙ্গী খোঁজা ও প্রজনন সম্পন্ন করে।
২) এদের দেখতে একই হলেও তারা ভিন্ন প্রজাতি হতে পারে। অনেক ন্যাট ও মিজ দেখতে এতটাই এক যে শুধু চোখে দেখে আলাদা প্রজাতি শনাক্ত করাই কঠিন। DNA বারকোডিংয়ের মাধ্যমে গবেষকেরা তাদের জিন পরিচয় নির্ণয় করতে পারেন। তাঁরা এমন নতুন প্রজাতিও খুঁজে পান, যেগুলো দীর্ঘদিন মানুষের চোখের আড়ালে ছিল। যুক্তরাজ্যের ন্যাচরাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামের বাগানেও এমন একটি ফাঙ্গাস ন্যাট পাওয়া গেছে, যেগুলোকে পূর্বে ইউরোপে অত্যন্ত বিরল বলে মনে করা হতো।
৩) কিছু মিজ আবার চাঁদের ছন্দে নিজেদের জীবন কাটায়। ক্লুনিও মারিন্যাস নামক সামুদ্রিক মিজের জীবনচক্র জোয়ার-ভাটার সঙ্গে সম্পর্কিত। পূর্ণিমা ও অমাবস্যার সময় যখন অত্যন্ত কম জোয়ার হয়, তখন তারা মাত্র কয়েক ঘণ্টার জন্য বেরিয়ে আসে, মিলিত হয়, ডিম পাড়ে এবং এরপর মারা যায়।
৪) এদের মধ্যে, কিছু মাছির ডানা থাকলেও তারা উড়তে পারে না। আবার কারোর হয়তো ডানাই নেই। যেমন Pontomyia গোত্রের পুরুষদের দৃশ্যমান ডানা থাকলেও সেগুলো দিয়ে উড়তে পারে না; আর স্ত্রীদের ডানাই নেই। Pnyxia ন্যাটের ক্ষেত্রেও পুরুষরা উড়তে পারে, কিন্তু স্ত্রী মাছি ডানাহীন। এই অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য কীভাবে বিবর্তিত হয়েছে, তা জিনোম গবেষণার একটি প্রশ্ন।
৫) ধানের দানার চেয়েও ছোট এই মাছি থেকে পর্যাপ্ত DNA সংগ্রহ করা বেশ কঠিন। তাই স্যাঙ্গার ইন্সটিটিউটের PiMmS প্রযুক্তি অতি সামান্য DNA থেকেও উচ্চমানের জিনোম তৈরি করতে সাহায্য করছে। বিশেষ করে প্রজনন কোষে থাকা germline-restricted chromosomes (GRCs) নিয়ে গবেষণায় এটি গুরুত্বপূর্ণ।
৬) মিজ সাধারণত ক্ষতিকর নয়, তবে কিছু স্ত্রী মিজ রক্ত খায়। যুক্তরাজ্যেই ৬৫০-এর বেশি মিজ প্রজাতি রয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ১৫০টি কামড়ায়। কেবল স্ত্রী মিজই রক্ত খায়, কারণ ডিম পরিণত করার জন্য তাদের অতিরিক্ত প্রোটিন প্রয়োজন। আবার পুরুষ মিজ বিশাল ঝাঁক তৈরি করে সঙ্গী আকর্ষণ করে,কখনও এত বড় ঝাঁক হয় যে দূর থেকে ধোঁয়ার মতো দেখায়।
গবেষকেরা বলছেন, এই ক্ষুদ্র মাছিগুলোকে শুধু বিরক্তিকর পতঙ্গ ভাবলেই হবে না। এদের DNA-র মধ্যেই কোটি বছরের বিবর্তন, প্রজনন ও জিনগত পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ সূত্র লুকিয়ে আছে।
সূত্র: https://onlinelibrary.wiley.com/doi/full/10.1111/j.1096-3642.2010.00680.x
https://www.mpg.de/25083746/coexistence-by-moonlight-how-midges-divide-time-and-space
