
পাখিরা আসলে ডাইনোসরের উত্তরসূরি। মুরগী বা উটপাখি যেভাবে দুই পায়ে সোজা হয়ে হাঁটে, ঈগল এবং বাজের ধারালো নখ ও তীক্ষ্ণ দৃষ্টি এসবের সঙ্গে “জুরাসিক পার্ক” এর বেলোসিরাপ্টরের অনেক সাদৃশ্য দেখা যায়। তবে পাখিরা এই ডাইনোসরদের থেকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক থেকে আলাদা, বিশেষ করে মস্তিষ্কের আকার ও আয়তনে। শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয় এবং মিসৌরি বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন গবেষণা থেকে দেখা যাচ্ছে, কিভাবে এই শারীরিক পরিবর্তনগুলি বিবর্তনের পথে এসেছে। মূলত তাদের চলাচল, খাওয়ার অভ্যাস এবং বাসা খোঁজার পদ্ধতিতে বিশেষ প্রভাব পড়ে। এই ধরনের পরিবর্তনই আজকের ডানাওয়ালা পাখির জন্ম দেয়। আধুনিক পাখি, সাপ এবং মাছের মতো অন্যান্য প্রাণীদের খুলির আকার এখন যেমন, তাতে তাদের চোয়াল ও তালু স্থির নয়। এটা কিন্ত স্তন্যপায়ীদের থেকে আলাদা। ইউশিকাগোর ইন্টিগ্রেটিভ বায়োলজির গবেষণা-প্রধান আলেক উইলকেন এই নমনীয় খুলিকে “কিলবিলে ” বলে অভিহিত করেন। খুলির অংশগুলো একসাথে কিভাবে কাজ করে তা বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে। শুধু সংযোগ আছে কিনা তা নয়, পুরো বিষয়টি কিভাবে নড়াচড়া করে, কোন পেশী সন্ধিতে টান দেয়, তাদের আবর্তন কেমন—সবকিছু বোঝা দরকার। মিসৌরি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যাথোলজি ও অ্যানাটমি বিজ্ঞানের সহযোগী কেসি হলিডে ডাইনোসর থেকে পাখিতে রূপান্তরের সময় কিভাবে খুলি, চোয়াল, পেশী এবং খাওয়ার কৌশল পরিবর্তিত হয় তা নিয়ে গবেষণা করেন। উইলকেন ২০১৫ সালে তার গবেষণাগারে যোগ দেন। তারা বিভিন্ন জীবাশ্ম, আধুনিক পাখি এবং সম্পর্কিত সরীসৃপ, যেমন কুমিরের সিটি স্ক্যান থেকে কাজ শুরু করেন। এই ছবির তথ্য ব্যবহার করে, তারা পরে ত্রিমাত্রিক মডেল তৈরি করেন। খুলি ও চোয়ালের বিবর্তনের ধারাবাহিকতা বুঝতে, পেশীর আকার, অবস্থান, তাদের নড়াচড়া এবং সবকিছু মিলিয়ে কীভাবে কাজ করে তা নিয়ে পদার্থবিদ্যার সূত্র প্রয়োগ করেন। আধুনিক পাখি ও অন্য প্রাণীদের মধ্যে মূল পার্থক্য হল, পাখিদের খুলি সংক্রান্ত পরিবর্তনের তথ্য রয়েছে। মানুষের মতোই, বড় মস্তিষ্ক খুলি বা অন্যান্য ক্ষেত্রে বিশেষ পরিবর্তন আনে। তাদের মাথার বিভিন্ন অংশ স্বাধীনভাবে নড়তে পারে। এটি পাখিদের বিবর্তনী সুবিধা দেয়—যেমন গাছের ডাল বা দাঁড়ের উপরে বসা বা খাবার খাওয়া। উদাহরণস্বরূপ, টিয়া বা ময়না তাদের ঠোঁটের উপর ভর দিয়েই আরোহণ করতে পারে। এই ঠোঁট, অন্যান্য পাখিদের বাদাম ও বীজ ভাঙতেও সাহায্য করে।
“ঠোঁট বা চঞ্চুটি কিছু অর্থে হাতের বিকল্প হিসাবে কাজ করে এবং খাওয়ার সময় তালুকে নড়াতে পারা, খাবার সংগ্রহ ও বেঁচে থাকার জন্য এটি এক গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক”। দলটি ত্রিমাত্রিক মডেলের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখেন—থিরোপড ডাইনোসরদের মস্তিষ্ক ও খুলির আকার বড় হবার জন্য তাদের পেশীগুলি নতুন অবস্থানে সরে যায়, যা তালুকে আলাদা হতে এবং গতিশীল হতে সাহায্য করে। এই পরিবর্তনগুলি পেশী শক্তি বাড়ায়, যা আধুনিক পাখিদের খুলির বিবর্তনের ফল। জীবাশ্ম বিশেষজ্ঞরা ডাইনোসর সম্পর্কে আরও তথ্য আবিষ্কার করছেন। এতে ডাইনোসর ও আধুনিক পাখিদের মধ্যে পার্থক্য বোঝা কঠিন। বিজ্ঞানীরা আগে পাখির পালককেই প্রধান পার্থক্য মনে করতেন। কিন্তু এখন জানা গেছে, অনেক ডাইনোসরেরও পালক ছিল। অন্যদিকে, ডানা ঝাপটানো বা ওড়ার ক্ষেত্রেও পাখিদের সাথে পার্থক্যের কথা ভাবলে বলা যায়, অনেক প্রসিদ্ধ ডাইনোসর উড়তে পারত। তবে নমনীয় খুলি ও তালু আর্কিয়াপ্টেরিক্সের মতো ডাইনোসর বা পাখির মধ্যে পার্থক্য তৈরি করে। হলিডে মনে করেন, খুলির এই বৈশিষ্ট্যই তাদের মধ্যে একটি স্পষ্ট ও প্রধান পার্থক্য হতে পারে।