ডানহাতি অণু, বাঁহাতি অণু

ডানহাতি অণু, বাঁহাতি অণু

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ৩০ এপ্রিল, ২০২৬

কেন জীবজগৎ একটা নির্দিষ্ট মুখে ঘুরে থাকা অণুকেই বেছে নিয়েছে, কিন্তু তার দর্পণ-প্রতিরূপকে নয়? এই প্রশ্ন বহুদিন ধরেই বিজ্ঞানীদের ভাবিয়েছে। জেরুজালেমের হিব্রু ইউনিভার্সিটি এবং ওয়েইজম্যান ইনস্টিটিউট অব সায়েন্সের বিজ্ঞানীদের গবেষণায় দাবি করা হয়েছে, এর পেছনে কাজ করতে পারে ইলেকট্রনের ‘স্পিন’ নামক মৌলিক কোয়ান্টাম ধর্ম। গবেষণাটি জীবনের উৎপত্তি ও অণুর গঠন নিয়ে দীর্ঘদিনের আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। কিছু অণুর গঠন এমন হয় যে তাদের দুটি রূপ থাকে। একটি ডান হাতি, অন্যটি বাঁহাতি। দেখতে প্রায় একই। তারা যেন একে অপরের প্রতিবিম্ব। বিজ্ঞানীরা এগুলিকে বলেন ‘কাইরাল’ অণু। রাসায়নিক গঠন একই হলেও জীবজগতে দেখা যায়, প্রাণীরা প্রায় সবসময় অ্যামিনো অ্যাসিডের একটি নির্দিষ্টমুখী রূপ ব্যবহার করে। আর শর্করার ক্ষেত্রে ব্যবহার করে তার বিপরীত রূপটি। এই একমুখী পছন্দকে বলা হয় ‘হোমোকাইরালিটি’। কিন্তু প্রকৃতি কেন এমন পক্ষপাত দেখায়, তার স্পষ্ট উত্তর এতদিন পাওয়া যায়নি। নতুন গবেষণায় বিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন, কাইরাল অণুর ভেতর দিয়ে চলার সময় ইলেকট্রন দুই ধরনের অণুর ক্ষেত্রে একভাবে আচরণ করে না। ইলেকট্রনের স্পিন এক ধরনের ক্ষুদ্র চৌম্বক বৈশিষ্ট্য। তা ডানহাতি ও বাঁহাতি রূপের অণুর সঙ্গে আলাদা ভাবে প্রতিক্রিয়া করে। ফলে এক ধরনের অণুর মধ্যে ইলেকট্রন পরিবহণ তুলনামূলকভাবে বেশি কার্যকর হতে পারে, আর অন্যটিতে কম। অর্থাৎ রাসায়নিকভাবে এক হলেও ইলেকট্রনের চলাচলের ক্ষেত্রে সূক্ষ্ম পার্থক্য তৈরি হয়। গবেষকদের মতে, এই পার্থক্য খুব ছোট হলেও দীর্ঘ সময়ে প্রকৃতির নানা পরিবেশে জমতে জমতে তা বড় প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে ধীরে ধীরে এক ধরনের অণু বেশি টিকে থাকতে বা বেশি গঠিত হতে পারে। এই ব্যাখ্যা ঠিক হলে জীবনের উৎপত্তি নিয়ে ধারণায় বড় পরিবর্তন আসতে পারে। এতদিন অনেক তত্ত্বে ধরে নেওয়া হতো, এই অণু-পছন্দ হয়তো নিছক আকস্মিক ঘটনা, অথবা বিশেষ পরিবেশগত কারণে ঘটে। কিন্তু নতুন গবেষণা বলছে, এর পেছনে কোয়ান্টাম স্তরের পদার্থবিজ্ঞানও কাজ করতে পারে। তবে এই প্রভাব স্থির রাসায়নিক ধর্ম থেকে আসে না, আসে গতিশীল প্রক্রিয়া থেকে। যেমন ইলেকট্রনের গতি, চার্জের আদানপ্রদান, বা চৌম্বক ক্ষেত্রের সঙ্গে আন্তঃক্রিয়া। অর্থাৎ অণু শুধু কী দিয়ে তৈরি, সেটাই সব নয়, তার ভেতরে কণাগুলি কীভাবে চলাফেরা করছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। এই আবিষ্কার শুধু জীববিজ্ঞানের রহস্যই নয়, ভবিষ্যতের প্রযুক্তিতেও নতুন পথ খুলে দিতে পারে। ন্যানোপ্রযুক্তি, কোয়ান্টাম রসায়ন, স্পিন-ভিত্তিক ইলেকট্রনিক্স এবং উন্নত উপাদানবিজ্ঞানে এর ব্যবহার হতে পারে বলে মনে করছেন গবেষকেরা। এমন অণু-ভিত্তিক যন্ত্র তৈরি করা যেতে পারে যেখানে ইলেকট্রনের স্পিন নিয়ন্ত্রণ করে কাজ করানো হবে। এতে আরও দ্রুত, ক্ষুদ্র ও শক্তি-সাশ্রয়ী প্রযুক্তি তৈরি সম্ভব হতে পারে। যদিও গবেষকেরা সতর্ক করে বলেছেন, এটি এখনও একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা। বিষয়টি নিশ্চিত করতে আরও পরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন। তবু এই গবেষণাকে জীবনের “ডানহাতি-বাঁ হাতি’’ রহস্য বোঝার পথে বড় অগ্রগতি হিসেবেই দেখা হচ্ছে। শতাব্দীরও বেশি পুরনো প্রশ্নের উত্তর হয়তো লুকিয়ে ছিল ইলেকট্রনের ক্ষুদ্রতম ঘূর্ণনেই।

 

সূত্র: Theory of Everything ; April; 2026

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

16 + fifteen =