‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’ পত্রিকায় গত ৪ জুন, চমকপ্রদ এক শিরোনামে একটি খবর প্রকাশ হয় —“ এই প্রথমবার মানব ভ্রূণের জিন নির্ভুলভাবে সম্পাদনা করলেন বিজ্ঞানীরা”। খবরটি প্রকাশ হবার পরই বিশ্বজুড়ে আবারও জোরালো হয়ে ওঠে জিন-সম্পাদিত শিশু বা ‘জিন এডিটেড বেবি’ তৈরির নিরাপত্তা, নৈতিকতা এবং প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বিতর্ক। তবে গবেষণার প্রকৃত তাৎপর্য অনেক বেশি সূক্ষ্ম। পরদিনই সংবাদপত্রটি তাদের শিরোনাম থেকে “প্রথম” কথাটি সরিয়ে দেয় । এ গবেষণার নেতৃত্ব দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টেম সেল বিজ্ঞানী ডিটার এগলি। তিনিও স্বীকার করছেন, প্রযুক্তিটির এখনও অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এটি ব্যবহার করে এখনই শিশু জন্ম দেওয়ার কথা ভাবা উচিত নয়। তাঁর মতে, এই গবেষণা বড়ো জোর আলোচনার ধরণ বদলাতে পারে, কিন্তু অদূর ভবিষ্যতে বাস্তব প্রয়োগের ক্ষেত্র তৈরি করবে না। মানব ভ্রূণে জিন সম্পাদনা নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। ২০১৮ সালে চীনের বিজ্ঞানী হে জিয়ানকুই ঘোষণা করেন যে তিনি CRISPR প্রযুক্তি ব্যবহার করে তিনটি শিশুর জিন পরিবর্তন করেছেন, যাতে তারা এইচআইভি সংক্রমণ প্রতিরোধী হয়। সেই দাবি বিশ্বজুড়ে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে। অজানা স্বাস্থ্যঝুঁকি সত্ত্বেও এমন পরীক্ষা চালানোর জন্য তাঁকে দায়িত্বজ্ঞানহীন আখ্যা দেওয়া হয়। পরে চীনের জৈব-নৈতিকতা ও বায়োমেডিক্যাল নিয়ম ভঙ্গের অভিযোগে তাঁকে কারাদণ্ডও ভোগ করতে হয়। CRISPR প্রযুক্তির প্রধান সমস্যা, এটি ডিএনএর দুইটি সূত্রই কেটে দেয়। কোষ অনেক সময় সেই ক্ষতি সঠিকভাবে মেরামত করতে পারে না। এতে অনাকাঙ্ক্ষিত জিন পরিবর্তন কিংবা গোটা ক্রোমোজোম হারিয়ে যাওয়ার মতো গুরুতর ত্রুটি দেখা দিতে পারে। আরেকটি বড় সমস্যা হলো ‘মোজেইকিজম’। অর্থাৎ, ভ্রূণের সব কোষে সমানভাবে সম্পাদনা না হওয়ায় কিছু কোষে পরিবর্তন ঘটে, কিছু কোষে ঘটে না। এই সব সমস্যা এড়ানোর লক্ষ্যেই এই দলটি ব্যবহার করেছে ‘বেস এডিটিং’ নামে পরিচিত CRISPR-এর একটি উন্নত সংস্করণ। প্রায় এক দশক আগে উদ্ভাবিত এই প্রযুক্তি ডিএনএর একটি মাত্র ‘অক্ষর’ পরিবর্তন করতে পারে। ফলে এটি তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি নির্ভুল এবং ডিএনএর ক্ষতিও কম করে। বর্তমানে শিশু ও প্রাপ্তবয়স্কদের বিভিন্ন বংশগত রোগের চিকিৎসায় এই প্রযুক্তি পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। গবেষণায় বিজ্ঞানীরা সরাসরি কোনো রোগসৃষ্টিকারী জিন সংশোধনের চেষ্টা করেননি। কারণ, এমন জিনযুক্ত IVF ভ্রূণ দান হিসেবে পাওয়া কঠিন। তার বদলে তাঁরা সদ্য নিষিক্ত ডিম্বাণুতে দুটি নির্দিষ্ট জিনগত পরিবর্তন যুক্ত করেন। এর মধ্যে একটি ছিল PCSK9 নামের জিনে, যা শরীরের কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে। এই জিনের কার্যকারিতা বন্ধ করে দিলে ক্ষতিকর কোলেস্টেরলের মাত্রা কমানো সম্ভব। অন্য পরিবর্তনটি করা হয় HBG1 এবং HBG2 জিনের নিয়ন্ত্রক অঞ্চলে। এর ফলে জন্মের পরও শরীর ভ্রূণকালীন হিমোগ্লোবিন উৎপাদন চালিয়ে যেতে পারে। এই কৌশল ভবিষ্যতে সিকল সেল রক্তাল্পতা প্রভৃতি জিনগত রক্তরোগের চিকিৎসায় কাজে লাগতে পারে। তবে মানব ভ্রূণে বেস এডিটিং এই প্রথম নয়। ২০১৭ সাল থেকেই একাধিক গবেষণা দল, বিশেষ করে চীনের বিজ্ঞানীরা, মানব ভ্রূণে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে পরীক্ষা চালিয়েছেন। কেউ কেউ পরীক্ষাগারে রোগসৃষ্টিকারী জিনও সফলভাবে সংশোধন করেছেন। এগলির গবেষণার বিশেষত্ব অন্য জায়গায়। তিনি দেখিয়েছেন, ভ্রূণের একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে বেস এডিটিং করলে বড় ধরনের জিনগত ক্ষতি ছাড়াই সম্পাদনা সম্ভব হতে পারে। গবেষকরা আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার কারণ খুঁজে পেয়েছেন। সাধারণত বেস এডিটিংয়ের জন্য ভ্রূণে মেসেঞ্জার আরএনএ প্রবেশ করানো হয়। কিন্তু তাঁদের গবেষণায় দেখা গেছে, এই এম আর এন এ সদ্য নিষিক্ত ডিম্বাণু ও প্রাথমিক ভ্রূণের জন্য বিষাক্ত হতে পারে। তাই তাঁরা পরীক্ষাগারে তৈরি প্রস্তুত প্রোটিন সরাসরি ভ্রূণে প্রবেশ করিয়ে ভালো ফল পেয়েছেন।
তবুও বিশেষজ্ঞরা সতর্ক। ব্রিটেনের রবিন লাভেল-ব্যাজ মনে করেন, এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে এখনই শিশু জন্ম দেওয়া “অত্যন্ত হঠকারী সিদ্ধান্ত” হবে। কারণ অনাকাঙ্ক্ষিত জিন পরিবর্তন এবং মোজেইকিজমের সমস্যা এখনও পুরোপুরি দূর হয়নি। এদিকে গবেষণাটি নিয়ে আরেকটি বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ভ্রূণ বিশ্লেষণকারী দুটি বেসরকারি সংস্থা এ গবেষণায় সহায়তা করেছে। এর মধ্যে একটি সংস্থা ভবিষ্যতে তথাকথিত ‘ডিজাইনার বেবি’ তৈরির সম্ভাবনা নিয়ে আগ্রহ দেখিয়েছে বলে সমালোচনা রয়েছে। এগলি অবশ্য স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, মানব ভ্রূণে বেস এডিটিং এখনও চিকিৎসাক্ষেত্রে ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত নয়। বর্তমানে IVF প্রযুক্তির মাধ্যমে ভ্রূণের জিন পরীক্ষা করে অনেক ক্ষতিকর মিউটেশন শনাক্ত করা সম্ভব। তাই ঝুঁকিপূর্ণ জিন সম্পাদনার প্রয়োজন সব ক্ষেত্রে নেই। তবুও কিছু বিরল পরিস্থিতিতে, যখন বাবা-মা উভয়ের কাছ থেকেই নিশ্চিতভাবে গুরুতর জিনগত রোগ সন্তানের মধ্যে সঞ্চারিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে, তখন ভবিষ্যতে ভ্রূণ সম্পাদনা একটি সম্ভাব্য বিকল্প হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন গবেষকেরা। তবে সেই পর্যায়ে পৌঁছাতে এখনও অনেক গবেষণা, নিরাপত্তা মূল্যায়ন এবং নৈতিক আলোচনা বাকি। আপাতত বিজ্ঞানীদের বার্তা একটাই—জিন সম্পাদনার প্রযুক্তি দ্রুত এগোলেও ‘জিন-সম্পাদিত শিশু’ তৈরির সময় এখনও আসেনি।
সূত্র: Science; 10.06.26 ; doi: 10.1126/science.z3ntesv
