ত্রুটিপূর্ণ নিউরন অপসারণ ও মস্তিষ্কের বিকাশ

ত্রুটিপূর্ণ নিউরন অপসারণ ও মস্তিষ্কের বিকাশ

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ৬ নভেম্বর, ২০২৬

মাতৃগর্ভে মানবমস্তিষ্কের বিকাশের সময় বিপুলসংখ্যক স্নায়ুকোষ বা নিউরন তৈরি হলেও তার সবগুলি শেষ পর্যন্ত টিকে থাকে না। জন্মের আগেই মস্তিষ্কের একটি স্বাভাবিক জৈবিক প্রক্রিয়ায় জিনের ত্রুটিযুক্ত বহু নিউরন অপসারিত হয়। নেচার পত্রিকায় ২৮ অক্টোবর ২০২৬-এ এ বিষয়ে গবেষণার সবিস্তার বিবরণ প্রকাশিত হয়েছে। তাতে বিজ্ঞানীরা এক অজানা প্রক্রিয়ার সন্ধান দিয়েছেন । তাঁদের মতে, মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষের সংখ্যা ও গুণমান নিয়ন্ত্রণে এই বাছাই প্রক্রিয়ার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।

গবেষকেরা ১৪ সপ্তাহের ভ্রূণ থেকে শুরু করে ৯০ বছরের বেশি বয়সি মানুষের মস্তিষ্কের নমুনা পরীক্ষা করেছেন। মোট ২,৩০০-র বেশি স্নায়ুকোষের জিন গঠন বিশ্লেষণ করেছেন‌। দেখা যায়, ভ্রূণের মস্তিষ্কে ২৫ শতাংশেরও বেশি নিউরনের ক্রোমোজ়োমের কিছু অংশ অনুপস্থিত অথবা অতিরিক্ত রয়েছে। এই জিনগত পরিবর্তনকে বলা হয় ‘কপি নম্বর ভ্যারিয়েশন’ (CNV)। অর্থাৎ, ডিএনএতে নির্দিষ্ট জিন বহনকারী ক্রোমোজ়োমীয় অংশের সংখ্যা স্বাভাবিকের তুলনায় বেড়ে যাওয়া অথবা কমে যাওয়া।

কিন্তু জন্মের পর শিশুদের মস্তিষ্কে এই ধরনের অস্বাভাবিক নিউরনের হার কমে দাঁড়ায় প্রায় ৬ শতাংশে। অর্থাৎ, ভ্রূণাবস্থায় থাকা জিনগত ত্রুটিযুক্ত বহু নিউরন জন্মের আগেই অপসারিত হয়। গবেষকদের ধারণা, তুলনামূলকভাবে অক্ষত জিনোমযুক্ত নিউরনগুলিই শেষ পর্যন্ত টিকে থাকার বেশি সুযোগ পায়।

কীভাবে মস্তিষ্ক এই ত্রুটিপূর্ণ কোষগুলিকে শনাক্ত করে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে গবেষণায় দেখা গেছে, বেশি CNV-যুক্ত নিউরনে সাইন্যাপস গঠনের সঙ্গে সম্পর্কিত জিনগুলির কার্যকলাপে অস্বাভাবিকতা থাকে। সাইন্যাপস হল দুটি স্নায়ুকোষের মধ্যে সংকেত আদান-প্রদানের সংযোগস্থল। বিজ্ঞানীদের অনুমান, যেসব নিউরন সঠিকভাবে অন্য নিউরনের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করতে পারে না, মস্তিষ্ক সম্ভবত সেগুলিকেই অপসারণ করে। এর ফলে কার্যকর ও সুসংগঠিত স্নায়ু-সংযোগ গড়ে ওঠে।

এই বাছাই প্রক্রিয়ায় কোনও ত্রুটি দেখা দিলে মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বিকাশ ব্যাহত হতে পারে। প্রয়োজনীয় স্নায়ুকোষ অতিরিক্ত মাত্রায় নষ্ট হলে অথবা ত্রুটিপূর্ণ নিউরন অপসারিত না হলে স্নায়ু-সংযোগের স্বাভাবিক বিন্যাস ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এর সঙ্গে অটিজ়ম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার (ASD) ও মৃগীরোগ প্রভৃতি স্নায়ুবিকাশজনিত সমস্যার সম্ভাব্য যোগসূত্র রয়েছে বলে গবেষকদের ধারণা।

এই গবেষণার প্রধান লেখক ডায়ান শাও ভবিষ্যতে এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে অটিজ়মের সম্পর্ক আরও বিশদে অনুসন্ধান করতে চান। অন্যদিকে, গবেষকেরা ডোপামিন উৎপাদনকারী নিউরনের ক্ষেত্রেও একই ব্যবস্থা কাজ করে কি না, তা জানতে আগ্রহী। কারণ, এই স্নায়ুকোষগুলোর অবক্ষয়ের সঙ্গে পারকিনসনস রোগের সম্পর্ক রয়েছে।

এক কথায় বলতে গেলে, সুস্থ মস্তিষ্ক গঠনের জন্য শুধু নতুন স্নায়ুকোষ তৈরি হওয়াই যথেষ্ট নয়। কোন কোষ টিকে থাকবে এবং কোনটি অপসারিত হবে, সেই সূক্ষ্ম জৈবিক নিয়ন্ত্রণও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

 

সূত্র: Shao, D. D. et al. Nature https://doi.org/10.1038/s41586-026-11190-3 (2026).

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

fifteen + five =