চাঁদের দক্ষিণ মেরুর অন্ধকার গহ্বরে সম্ভাব্য বরফের সন্ধানে চীনের উচ্চাভিলাষী ছাঙ’এ-৭ মিশন শেষ মুহূর্তে স্থগিত হয়েছে। ২৪ শে আগস্ট উৎক্ষেপণের কথা থাকলেও, তার মাত্র এক দিন আগে অর্থাৎ, ২৩শে আগস্ট চীনা কর্তৃপক্ষ জানায়, নির্ধারিত উৎক্ষেপণ-পর্বে মিশনটি পরিচালনার প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ করছে না। নতুন সময়সূচি এখনও জানানো হয়নি। তবে অভিযানটি ২০২৭ সালেও হতে পারে।
ছাঙ’এ-৭ মিশন স্থগিতের নির্দিষ্ট কারণ প্রকাশ করেনি চীন। ওয়েনচাং উৎক্ষেপণকেন্দ্রের কাছে ক্রান্তীয় ঝড়ের প্রভাবে প্রবল বাতাসকে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে ধরা হচ্ছে। একই সঙ্গে রকেট বা মহাকাশযানের প্রযুক্তিগত সমস্যার সম্ভাবনাও রয়েছে। কারণ, এর মাত্র দুই সপ্তাহ আগে একই ধরনের ইঞ্জিন ব্যবহারকারী একটি লং মার্চ-৭এ রকেট উৎক্ষেপণের ৯০ সেকেন্ডেরও কম সময়ের মধ্যে বিস্ফোরিত হয়েছিল। যদিও দুটি ঘটনার মধ্যে সরাসরি কোনো যোগসূত্র আছে কিনা তা নিশ্চিত নয়।
ছাঙ’এ-৭ ছিল সরাসরি অনুসন্ধানের লক্ষ্য নিয়ে গড়ে ওঠা একাধিক আন্তর্জাতিক অভিযানের অগ্রবর্তী মিশন। এর লক্ষ্য চাঁদের দক্ষিণ মেরুর স্থায়ী অন্ধকারাচ্ছন্ন গহ্বরগুলোতে থাকা বরফের প্রকৃতি, পরিমাণ ও উৎপত্তি অনুসন্ধান করা। বহু বছর ধরে চাঁদের কক্ষপথে বিভিন্ন মহাকাশযানের পর্যবেক্ষণে এসব অঞ্চলে বরফ থাকার ইঙ্গিত মিলেছে। কিন্তু দূরবর্তী পর্যবেক্ষণ থেকে তার প্রকৃত মজুত কিংবা সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা যায়নি। ছাঙ’এ-৭ সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে চাঁদের দক্ষিণ মেরুর কাছে অবতরণ করে সরাসরি বিভিন্ন যন্ত্রের সাহায্যে অনুসন্ধান ও নমুনা সংগ্রহের পরিকল্পনা করেছিল।
এই বরফের গুরুত্ব বৈজ্ঞানিক কৌতূহলের চেয়েও অনেক বড়। যদি বরফের অস্তিত্ব সত্য হয় তবে বরফ থেকে পাওয়া জল ভবিষ্যৎ চন্দ্র অভিযাত্রীদের পানীয় ও অন্যান্য প্রয়োজন মেটাবে। আরও গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হল, জলকে বিভাজিত করে অক্সিজেন ও হাইড্রোজেন তৈরি করা সম্ভব। যার একটি শ্বাস-প্রশ্বাসে এবং অন্যটি রকেটের জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। ফলে চাঁদের স্থানীয় সম্পদ কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যতের মানবঘাঁটির পরিচালন ব্যয় ও পৃথিবী-নির্ভরতা কমানোর সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
চীনের এই উদ্যোগ বৃহত্তর আন্তর্জাতিক চন্দ্র অনুসন্ধানের অংশ। নাসার VIPER রোভার, ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার PROSPECT ড্রিলিং মিশন এবং জাপান-ভারতের যৌথ LUPEX প্রকল্পও চাঁদের মেরু অঞ্চলের বরফ অনুসন্ধানে প্রস্তুত হচ্ছে। ছাঙ’এ-৭ -এর উৎক্ষেপণ ২০২৭ সালের শুরুতে হলে, চীন এই অনুসন্ধানে অগ্রণী অবস্থান ধরে রাখতে পারবে।
একটা অভিযান তো আর মহাকাশ দখলের প্রতিযোগিতা নয়। বিজ্ঞানীদের মতে চাঁদে বরফের অস্তিত্ব নিশ্চিত হলে সেটা হবে চাঁদে দীর্ঘমেয়াদি মানব বসতি স্থাপনের পথে মাত্র প্রথম ধাপ। প্রকৃত চ্যালেঞ্জ হবে সেই বরফকে উত্তোলন করা, বিশুদ্ধ করা এবং নিয়মিত ব্যবহারের উপযোগী করে তোলা। তাই ছাঙ’এ-৭ -এর সাফল্য চাঁদে জল আছে কি না—এই প্রশ্নের উত্তরের পাশাপাশি চাঁদে মানুষের দীর্ঘমেয়াদি উপস্থিতি কতটা বাস্তবসম্ভব, সেই গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিতও দেবে।
সূত্র: Chang’e-7, which will investigate the origin of and abundance of lunar ice, set back until 2027, 24 Aug 202612:20 PM ETByDennis Normile, doi: 10.1126/science.zkejcek
