থর মরু সবুজ হচ্ছে, কিন্তু …

থর মরু সবুজ হচ্ছে, কিন্তু …

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২ জানুয়ারী, ২০২৬

ভারতের থর মরু মানেই দীর্ঘদিন ধরে শুষ্কতা, বালু আর কঠিন জীবন। কম বৃষ্টি, গাছপালার অভাব-এই ছিল তার পরিচয়। কিন্তু সেই পরিচয় বদলাচ্ছে। থর ধীরে ধীরে সবুজ হয়ে উঠছে। প্রথমে শুনতে এটি আশার খবর মনে হলেও, বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই পরিবর্তনের ভেতরে লুকিয়ে আছে বড় প্রশ্ন আর ভবিষ্যতের ঝুঁকি।

আইআইটি গান্ধীনগরের জলবিজ্ঞানী অধ্যাপক বিমল মিশ্রর মতে, থরের এই সবুজায়ন একদিকে সাফল্য, অন্যদিকে সতর্কবার্তা। কারণ, এই পরিবর্তনের সবটাই প্রাকৃতিক নয়। গত কয়েক দশকে থর অঞ্চলে গাছপালা ও ঘাসের পরিমাণ চোখে পড়ার মতো বেড়েছে। গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, এক-তৃতীয়াংশের বেশি এলাকায় সবুজ আচ্ছাদন বৃদ্ধি পেয়েছে। এর পেছনে কারণ মূলত দুটি। এক, বৃষ্টিপাত বেড়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে পশ্চিম ভারতের কিছু অংশে আগের তুলনায় বেশি বৃষ্টি হচ্ছে, যা মরু অঞ্চলে গাছ জন্মানোর সুযোগ তৈরি করছে। দুই, মানুষের হস্তক্ষেপ। সেচ ব্যবস্থার বিস্তার, নলকূপের মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ জল তোলা এবং কৃষিকাজ বাড়ার ফলে থরের বহু এলাকায় নতুন ফসল, বাগান ও বসতি গড়ে উঠেছে।
এই পরিবর্তন দেখতে ভালো লাগলেও, বিজ্ঞানীদের প্রশ্ন, এই সবুজায়ন কতটা টেকসই? থরের অনেক জায়গায় যে সবুজ দেখা যাচ্ছে, তা মূলত নির্ভর করছে ভূগর্ভ জলের উপর। কিন্তু এই জল সীমিত। অতিরিক্ত ব্যবহার চলতে থাকলে জলস্তর দ্রুত নেমে যাবে, আর তখন এই সবুজ আবার শুকিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকবে। অধ্যাপক বিমল মিশ্রর কথায়, “জল ব্যবহারের ধরন না বদলালে আজকের সবুজই আগামী দিনের সংকট হয়ে উঠতে পারে।“ থর মরু শুধু একটি এলাকা নয়, এটি একটি সংবেদনশীল বাস্তুতন্ত্র। এর নিজস্ব উদ্ভিদ, প্রাণী ও জলবায়ুর ভারসাম্য রয়েছে। হঠাৎ বড় পরিবর্তনে সেই ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে। গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, গাছপালা বাড়লে ভূমির তাপ শোষণের ধরন বদলায়, ধুলোর পরিমাণ কমে গেলে বাতাস ও বৃষ্টির স্বাভাবিক চক্রও প্রভাবিত হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব বর্ষা ও স্থানীয় আবহাওয়ায় পড়তে পারে। অর্থাৎ, থরের বদল শুধু ঐ অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ নয়। সবুজ থর মানুষের জন্য সুযোগও আনছে। নতুন কৃষিজমি, কাজের সুযোগ এবং বসবাসের সম্ভাবনা বাড়ছে। অনেক স্থানীয় মানুষ এতে উপকৃত হচ্ছেন। কিন্তু একই সঙ্গে ঝুঁকিও বাড়ছে। যদি জল ব্যবস্থাপনা ঠিক না হয়, কয়েক দশকের মধ্যেই এই এলাকাগুলি আবার শুষ্ক হয়ে যেতে পারে। তখন কৃষি, জীবনযাপন ও পরিবেশ, সবই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, থারের সবুজায়ন থামানো নয়, বরং বুদ্ধিমানের মতো নিয়ন্ত্রণ করাই আসল চ্যালেঞ্জ। এর জন্য দরকার ভূগর্ভস্থ জলের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ, বৃষ্টির জল সংরক্ষণ, স্থানীয় পরিবেশের সঙ্গে মানানসই গাছ ও ফসল বেছে নেওয়া এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। থর মরুর সবুজ হয়ে ওঠা আমাদের আশা দেখায়, প্রকৃতি বদলাতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে মনে করিয়ে দেয়, পরিকল্পনা ও টেকসই ব্যবস্থাপনা ছাড়া সব পরিবর্তন শেষ পর্যন্ত ভালো নাও হতে পারে।

সূত্র : ‘Greening of the Thar is both a success story and a warning’: Vimal Mishra, IIT professor; By Shubhangi Shah; Dec, 2025.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

five × four =