দণ্ডাকৃতি ব্যাকটেরিয়ার রহস্য উদঘাটন

দণ্ডাকৃতি ব্যাকটেরিয়ার রহস্য উদঘাটন

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ৬ জুন, ২০২৬

ব্যাকটেরিয়া কেন লম্বাটে বা দণ্ডের মতো আকার ধারণ করে, তার রহস্যের সমাধান করলেন গবেষকেরা। নতুন গবেষণায় জানা গেছে, ব্যাকটেরিয়ার গায়ের উপর থাকা বিশেষ ধরনের অ্যাসিড তাদের এই দণ্ড আকৃতি ধরে রাখতে সাহায্য করে। এই অ্যাসিড না থাকলে ব্যাকটেরিয়া গোলমেলে আকারের থকথকে পিণ্ডে পরিণত হয়। এই গবেষণা শুধু ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি ও গঠন সম্পর্কে নতুন ধারণাই দেয়নি, পাশাপাশি অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ মোকাবিলার সম্ভাবনাও দেখিয়েছে। ব্যাকটেরিয়া নানা ধরনের আকারের হতে পারে, তবে সবচেয়ে বেশি দেখা যায় দণ্ড-আকৃতির ব্যাকটেরিয়া। ব্যাকটেরিয়ার বাইরের শক্ত কোষ আবরণ বা সেল ওয়ালই তাদের আকৃতি ঠিক করে দেয়। আর এই সেল ওয়ালই বহু গুরুত্বপূর্ণ অ্যান্টিবায়োটিকের প্রধান নিশানা। গবেষণাপত্রর প্রধান লেখক ফেলিক্স বারবার জানান, ব্যাকটেরিয়ার আকৃতিই নির্ধারণ করে তারা কীভাবে বাড়বে, বিভাজিত হবে এবং পরিবেশের সঙ্গে কীভাবে ক্রিয়া বিক্রিয়া ঘটাবে। তাই ব্যাকটেরিয়ার আকার নিয়ন্ত্রণকারী উপাদানগুলিকে বোঝা চিকিৎসাবিজ্ঞানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ব্যাসিলাস সাবটিলিস নামে একটি ব্যাকটেরিয়া নিয়ে কাজ চলছে। এটি সাধারণত মাটি ও মানুষের অন্ত্রে পাওয়া যায়। “ভালো” বা উপকারী ব্যাকটেরিয়া হিসেবে পরিচিত এই জীবাণু জাপানের জনপ্রিয় খাবার তোততো, অ্যান্টিবায়োটিক, ত্বকের পরিচর্যায় ব্যবহৃত হায়ালুরোনিক অ্যাসিড এবং কৃষিক্ষেত্রে বিভিন্ন পণ্যে ব্যবহার করা হয়। ব্যাকটেরিয়ার কোষ প্রাচীর মূলত দু’টি উপাদানে তৈরি -পেপটিডোগ্লাইকান এবং ওয়াল টাইকোয়িক অ্যাসিড। বহুদিন ধরেই জানা ছিল, টাইকোয়িক অ্যাসিড সরিয়ে দিলে ব্যাকটেরিয়া দণ্ড আকৃতি হারিয়ে অদ্ভুত থকথকে আকার নেয়। কিন্তু কেন এমন হয়, তা পরিষ্কার ছিল না। নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক এনরিকে রোহাস বলেন, কয়েক দশক ধরে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছিলেন বিজ্ঞানীরা। অবশেষে নতুন গবেষণায় সেই রহস্যের সমাধান হয়েছে। তাঁরা বিশেষ ধরনের লেজার-যুক্ত মাইক্রোস্কোপ ব্যবহার করে ব্যাকটেরিয়ার ভেতরের অণুগুলির গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করেন। একই সঙ্গে “মাইক্রোফ্লুইডিক্স” প্রযুক্তি ব্যবহার করে জীবন্ত ব্যাকটেরিয়ার শরীর থেকে টাইকোয়িক অ্যাসিড সরিয়ে তার প্রভাব দেখা হয়। টাইকোয়িক অ্যাসিড সরিয়ে দিলে দণ্ড সমাহার নামে একদল প্রোটিনের কাজ প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। একই সঙ্গে সক্রিয় হয়ে ওঠে PBP1 নামে একটি উৎসেচক। সাধারণ অবস্থায় এই উৎসেচক শুধু কোষ প্রাচীরের ছোটখাটো ভুল মেরামত করে। কিন্তু টাইকোয়িক অ্যাসিড না থাকলে সেটি এলোমেলোভাবে কোষ প্রাচীর তৈরি করতে শুরু করে। ফলে দণ্ড আকৃতি নষ্ট হয়ে ব্যাকটেরিয়া পিণ্ডে পরিণত হয়। বিজ্ঞানীরা আরও দেখেছেন, টাইকোয়িক অ্যাসিড কমে গেলে কোষ প্রাচীরে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ছিদ্র তৈরি হয়। গবেষকদের মতে, টাইকোয়িক অ্যাসিড আসলে রাস্তার পিচের মতো কোষ প্রাচীরের পৃষ্ঠকে মসৃণ রাখে। এতে গুরুত্বপূর্ণ প্রোটিনগুলি ঠিকভাবে কাজ করতে পারে। গবেষণায় আরও জানা গেছে, শুধু PBP1 নয়, LytE নামে আরেকটি উৎসেচকও এই বিকল্প বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজন। এই উৎসেচক কোষ প্রাচীর কেটে নতুন গঠন তৈরি করতে সাহায্য করে। বিজ্ঞানীদের মতে, ব্যাকটেরিয়ার এই “ব্যাকআপ প্ল্যান” অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধের সঙ্গে জড়িত হতে পারে। কারণ কিছু ওষুধ টাইকোয়িক অ্যাসিড তৈরির প্রক্রিয়া বন্ধ করলেও ব্যাকটেরিয়া বিকল্প উপায়ে বেঁচে থাকতে পারে। এ গবেষণা পৃথিবীর আদিম জীব সম্পর্কেও নতুন ধারণা দিয়েছে। গবেষকদের ধারণা, পৃথিবীর প্রথম জীবগুলি হয়তো নির্দিষ্ট কোনও আকৃতি ছাড়াই থকথকে কোষের মতো ছিল। টাইকোয়িক অ্যাসিডহীন ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি হয়তো সেই প্রাচীন জীবনেরই একটি মডেল। এই আবিষ্কার অন্য বিপজ্জনক ব্যাকটেরিয়ার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। যেমন খাদ্যবাহিত রোগের জন্য দায়ী লিস্টেরিয়া মনোসাইটোজেনেসও টাইকোয়িক অ্যাসিড হারালে আকৃতি বদলে ফেলে। আবার ভয়ঙ্কর অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী MRSA ব্যাকটেরিয়ার ক্ষেত্রেও টাইকোয়িক অ্যাসিড তৈরির প্রক্রিয়া বন্ধ করলে অ্যান্টিবায়োটিক আবার কার্যকর হতে পারে বলে আগের গবেষণায় দেখা গিয়েছে। ফলে বিজ্ঞানীদের আশা, ভবিষ্যতে টাইকোয়িক অ্যাসিডকে নিশানা করে নতুন ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক তৈরি করা সম্ভব হতে পারে।

 

সূত্র: The Microbiologist ; May ; 2026

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

1 × 4 =