দাবানল সাধারণত শুষ্ক আবহাওয়া, তীব্র গরম, প্রবল বাতাস এবং বজ্রপাত—এসব কারণেই দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু বিজ্ঞানীরা দেখছেন, যখন কোনো দাবানল অত্যন্ত তীব্র আকার ধারণ করে, তখন পরিস্থিতি পাল্টে যায়। তখন আগুন আর নিছক ওইসব কারণে নিয়ন্ত্রিত হয় না, বরং নিজেই আশপাশের আবহাওয়াকে বদলে দিতে শুরু করে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় উঠে এসেছে, শক্তিশালী দাবানল টর্নেডো, বজ্রঝড়, বজ্রপাত যে এলাকায় আগুন লেগেছে তার থেকেও বহু দূরের আবহাওয়াকে প্রভাবিত করে।
দাবানলের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ প্রভাবগুলোর একটি হলো শক্তিশালী ঊর্ধ্বমুখী বায়ুপ্রবাহ। আগুনের প্রচণ্ড তাপে উপরের বাতাস উষ্ণ হয়ে হালকা হয়ে গিয়ে দ্রুত ওপরে উঠতে থাকে। কখনও এই ঊর্ধ্বমুখী বায়ু ঘূর্ণায়মান হয়ে অগ্নি-ঘূর্ণি বা ফায়ার হোয়ার্ল বা আগুনে টর্নেডো তৈরি করে। এটি সাধারণ টর্নেডোর মতো হলেও আকারে ছোট। আগুনের তাপ থেকেই শক্তি সংগ্রহ করে বলে এরা সাধারণত আগুনের আশপাশেই সীমাবদ্ধ থাকে।
এই উত্তপ্ত ধোঁয়া ও গ্যাসের স্তম্ভে প্রচুর জলীয় বাষ্পও থাকে, যা আসে পোড়া উদ্ভিদ ও পরিবেশ থেকে। ওপরে উঠতে উঠতে বাষ্প ঠান্ডা হয়ে পাইরোকিউমুলাস বা অগ্নিমেঘ তৈরি করে। দাবানল আরও তীব্র হলে এবং বায়ুমণ্ডল অস্থিতিশীল থাকলে এই মেঘ আরও উঁচুতে উঠে পাইরোকিউমুলোনিম্বাস-এ পরিণত হয়। এটি কার্যত দাবানল থেকেই জন্ম নেওয়া একটি বজ্রঝড়।
এই অগ্নিজাত বজ্রঝড়ে বরফকণা, অতিশীতল জলকণা ও নরম শিলার মতো কণার সংঘর্ষে বৈদ্যুতিক চার্জের বিভাজন ঘটে। চার্জের পার্থক্য অনেক বেড়ে গেলে বজ্রপাত হয়। এসব বজ্রপাতের বেশিরভাগই মূল আগুনের সীমানার বাইরেও নতুন দাবানলের সূত্রপাত ঘটাতে পারে। ফলে আগুন আরও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং সেই লেলিহান শিখাকে নেভানো দূরহ হয়ে যায়।
দাবানলের ধোঁয়ার প্রভাব শুধু আগুনের আশপাশেই সীমাবদ্ধ থাকে না। ধোঁয়া শত শত, এমনকি হাজার হাজার কিলোমিটার দূর পর্যন্ত ভেসে যেতে পারে। ধোঁয়ার অতি সূক্ষ্ম কণাগুলো ক্লাউড কনডেনসেশন নিউক্লিয়াই/মেঘের ঘনীভবন কেন্দ্রক হিসেবে কাজ করে। তারই ওপর জলীয় বাষ্প ঘনীভূত হয়ে মেঘ তৈরি হয়। কিন্তু অতিরিক্ত সংখ্যক কণার কারণে একই পরিমাণ জল অসংখ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জলবিন্দুতে ভাগ হয়ে যায়। ফলে বড় বৃষ্টির ফোঁটা তৈরি হতে বেশি সময় লাগে, বৃষ্টিপাত বিলম্বিত হতে পারে বা মেঘ অন্যত্র সরে যেতে পারে। এতে আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
শুধু তাই নয়, আরও দেখা গেছে, দাবানলের ধোঁয়া বজ্রপাতের ধরনও বদলে দিতে পারে। সাধারণ অবস্থায় ভূমিতে আঘাত হানা অধিকাংশ বজ্রপাত ঋণাত্মক চার্জ বহন করে। কিন্তু ধোঁয়ায় প্রভাবিত বজ্রঝড়ে ধনাত্মক চার্জযুক্ত বজ্রপাতের সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। এই ধরনের বজ্রপাতের শক্তি অনেক বেশি, এরা বেশি দীর্ঘস্থায়ী এবং বেশি শক্তিবাহী। ফলে এগুলো নতুন করে দাবানল সৃষ্টি করে, অবকাঠামোর ক্ষতি করে এবং মানুষের জন্য বড় বিপদ তৈরি করে।
বিজ্ঞানীদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বজুড়ে বড় বড় দাবানলের সংখ্যা বাড়ছে। তাই ভবিষ্যতে শুধু আগুন নেভানোর কৌশল নয়, দাবানল কীভাবে বায়ুর গুণমান, জনস্বাস্থ্য এবং আবহাওয়াকে প্রভাবিত করে, সে বিষয়েও প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি। কারণ দাবানলের ধোঁয়া আজ আর কেবল আকাশ ঢেকেই ক্ষান্ত থাকছে না, বায়ুমণ্ডলের অংশ হয়ে আবহাওয়ার গতিপ্রকৃতিও বদলে দিচ্ছে।
সূত্র: https://theconversation.com/wildfires-can-generate-tornadoes-lightning-and-other-extreme-weather-sometimes-miles-from-the-flames
