মানবদেহের অনাক্রম্য তন্ত্র বা ইমিউন সিস্টেম মূলত দ্রুত ও কার্যকর যোগাযোগের উপর নির্ভরশীল। শরীরে যখন কোনো ক্ষতিকর জীবাণু বা বহিরাগত পদার্থ প্রবেশ করে, তখনই এই ব্যবস্থা সক্রিয় হয়ে ওঠে। এ সময় শরীর থেকে বিশেষ ধরনের রাসায়নিক সংকেত নিঃসৃত হয়, যেগুলিকে বলা হয় ‘কেমোকাইন’। যেখানে সংক্রমণ ঘটেছে, সেখানে প্রতিরোধক কোষগুলোকে দ্রুত পৌঁছে যেতে নির্দেশ দেয় এই কেমোকাইন। ফলত সেই স্থানে প্রতিরোধক কোষ জমা হয়ে আক্রমণকারী জীবাণুকে নিয়ন্ত্রণ ও ধ্বংস করতে পারে।
কিন্তু প্রকৃতিতে কিছু পরজীবী রয়েছে, যারা এই প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে ফাঁকি দেওয়ার জন্য বিশেষ কৌশল তৈরি করেছে। যেমন, টিক বা রক্তচোষা এঁটুলি পরজীবী। এরা রক্ত খেয়ে বেঁচে থাকে এবং আশ্চর্যের বিষয়, দীর্ঘ সময় ধরে শরীরে এঁটে থাকলেও চট করে ধরা পড়ে না। এর পেছনে রয়েছে তাদের একটি সূক্ষ্ম জৈব কৌশল। এরা তাদের লালার মাধ্যমে ‘ইভেসিন’ নামক বিশেষ প্রোটিন নিঃসরণ করে। এই ইভেসিন, কেমোকাইনগুলিকে আটকে দেয় বা নিষ্ক্রিয় করে ফেলে। ফলে শরীরের প্রতিরোধ ব্যবস্থা ঠিকমতো সতর্ক সংকেত পায় না। সহজভাবে বললে, রক্তচোষা এঁটুলি যেন শরীরের অ্যালার্ম সিস্টেমটাই বন্ধ করে দেয়। ফলে সংক্রমণস্থলে প্রদাহ তৈরি হয় না এবং প্রতিরোধক কোষগুলো সেখানে পৌঁছাতে পারে না বা দেরী করে পৌঁছায়। এই সুযোগে রক্তচোষা এঁটুলি নিরবচ্ছিন্নভাবে রক্ত শোষণ করতে পারে। তবে কেমোকাইন সবসময় শরীরের জন্য উপকারীও নয়। এদের কার্যকলাপ অতিরিক্ত বা অনিয়ন্ত্রিত হয়ে গেলে, দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এই ধরনের দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহই বহু গুরুতর রোগের মূল চালিকা শক্তি হতে পারে। যেমন, রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস, মাল্টিপল স্ক্লেরোসিস, প্রদাহজনিত অন্ত্রের রোগ, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে ক্যানসারও। এসব রোগে প্রতিরোধ ব্যবস্থার অতিরিক্ত সক্রিয়তা তখন শরীরের সুস্থ কোষ ও টিস্যুকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে।
এই প্রেক্ষাপটে অস্ট্রেলিয়ার মোনাশ বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োমেডিসিন ডিসকভারি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মার্টিন স্টোন এবং ড. রাম ভূসাল-এর নেতৃত্বাধীন গবেষকরা একটি গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার করেছেন। তারা এমন একটি রক্তচোষা এঁটুলি-উৎপন্ন ইভেসিন শনাক্ত করেছেন, যা একসঙ্গে দুটি প্রধান ধরনের কেমোকাইনকে বাঁধতে বা নিষ্ক্রিয় করতে সক্ষম। আগে জানা ইভেসিনগুলো মূলত এক ধরনের কেমোকাইনের উপরেই কাজ করত। কিন্তু নতুন ইভেসিন একাধিক কেমোকাইন গ্রুপকে একসঙ্গে প্রভাবিত করতে পারবে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে এ এক বড় অগ্রগতি। সহগবেষক মি. কুনওয়ার এবং ড. দেবকোটার বক্তব্য অনুযায়ী, “ আগে মনে করা হত, প্রতিটি ইভেসিন আলাদা আলাদা কেমোকাইন গ্রুপকে লক্ষ্য করে। কিন্তু এই নতুনভাবে চিহ্নিত ইভেসিন একই সঙ্গে দুটি প্রধান কেমোকাইন শ্রেণিকে বাধা দিতে পারবে। ফলে এমন ওষুধ তৈরি করা যাবে, যা বিশেষভাবে কেমোকাইন-নির্ভর প্রদাহজনিত রোগকে নিশানা করে কাজ করবে। বর্তমানে এসব রোগের চিকিৎসার জন্য কিছু ওষুধ থাকলেও, রোগের অগ্রগতি পুরোপুরি থামানোর মতো কার্যকর পদ্ধতি ছিল সীমিত’’। সব মিলিয়ে বলা যায়, প্রকৃতির এই সূক্ষ্ম কৌশলগুলো বুঝতে পারলে ভবিষ্যতের চিকিৎসা বিজ্ঞান উপকৃত হবে।
সূত্রঃ DOI: 10.1016/j.str.2026.02.001
