নিউক্লিয়ার ফিউশান বিক্রিয়ায় ঐতিহাসিক সাফল্য 

নিউক্লিয়ার ফিউশান বিক্রিয়ায় ঐতিহাসিক সাফল্য 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২৪ মার্চ, ২০২৬

ফ্রান্সের International Thermonuclear Experimental Reactor (ITER) প্রকল্পে কর্মরত বিজ্ঞানীরা একটি ঐতিহাসিক সাফল্য অর্জন করেছেন। কাদরাশে অবস্থিত এক গবেষণা কেন্দ্রে তারা প্রায় ৬ মিনিট ধরে স্থায়ী নিউক্লীয় সংযোজন বিক্রিয়া বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছেন। বিক্রিয়া শুরু করতে যে শক্তি প্রয়োজন, তার তুলনায় প্রায় ১.৫ গুণ বেশি শক্তি উৎপাদন করা সম্ভব হয়েছে। এতদিন বিজ্ঞানীদের কাছে এটি এক অধরা লক্ষ্য ছিল। মানবজাতির জন্য এ এক বিশাল অগ্রগতি, কারণ এই প্রথম পৃথিবীতে সূর্যের শক্তি উৎপাদনের প্রক্রিয়াকে বাস্তবায়নের সবচেয়ে কাছাকাছি পৌঁছানো গেল।

এই ফিউশন প্রক্রিয়ায় অত্যন্ত উচ্চ তাপে (প্রায় ১৫০ মিলিয়ন ডিগ্রি সেলসিয়াস) এবং চাপে হাইড্রোজেনের আইসোটোপগুলো একত্রিত হয়ে হিলিয়াম পরমাণু তৈরী হয়। ফলে বিপুল পরিমাণ শক্তি উৎপন্ন হয়, কিন্তু কোনো মারাত্মক তেজস্ক্রিয় বর্জ্যের ঝুঁকি তৈরি হয় না। এটি বর্তমান পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলিতে ব্যবহৃত ফিশন (পরমাণু বিভাজন) প্রক্রিয়ার সম্পূর্ণ বিপরীত।

এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে উন্নত সুপারকন্ডাক্টিং চুম্বক প্রযুক্তি, যেগুলোকে প্রায় -২৬৯ডিগ্রী সেলসিয়াস তাপমাত্রায় ঠান্ডা রাখা হয়। এই চুম্বকগুলো ডোনাট-আকৃতির রিঅ্যাক্টরের ভেতরে অতি উত্তপ্ত প্লাজমাকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে। এতদিন পর্যন্ত এই বিক্রিয়াকে দীর্ঘ সময় ধরে স্থায়ী রাখাই ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। ফ্রান্স সেই বাধা অতিক্রম করতে সফল হল।

শক্তির দিক থেকে এর সম্ভাবনা সত্যিই বিপ্লবাত্মক। মাত্র ১ গ্রাম ফিউশন জ্বালানি (সমুদ্রের জল থেকে প্রাপ্ত ভারী জল বা ডিউটেরিয়াম) প্রায় ৮ টন তেলের সমপরিমাণ শক্তি উৎপন্ন করতে পারে। এ ধরণের জ্বালানির পরিমাণ প্রায় সীমাহীন। পৃথিবীর মহাসাগরে এত বিপুল পরিমাণ ডিউটেরিয়াম রয়েছে যে তা দিয়ে লক্ষ লক্ষ বছর ধরে মানবসভ্যতাকে চালানো সম্ভব। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এই প্রক্রিয়ায় কোনো প্রকার কার্বন নিঃসরণ হয় না, পারমাণবিক দুর্ঘটনার ঝুঁকি নেই, এবং তেজস্ক্রিয় বর্জ্যও খুবই কম। এসব কারণেই এটি অত্যন্ত নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব শক্তির উৎস।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০৩৫ সালের মধ্যেই বাণিজ্যিক ফিউশন বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হতে পারে। যার ফলে আমাদের জীবাশ্ম জ্বালানির উপর নির্ভরতা আংশিক হলেও কমবে আশা করা যায়।

 

সূত্র: ITER Organization, Nature Energy 2025

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

12 − seven =