নিউট্রিনোরও ভর আছে 

নিউট্রিনোরও ভর আছে 

অঙ্কিতা গাঙ্গুলী বিজ্ঞানভাষ সম্পাদকীয় বিভাগ
Posted on ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
Default Alt Text

নিউট্রিনো মহাবিশ্বের অন্যতম ক্ষীণ ক্রিয়াশীল মৌলিক কণা। প্রতি সেকেন্ডে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ( ১ ট্রিলিয়ন= ১ লক্ষ কোটি প্রায়) নিউট্রিনো আমাদের শরীরের মধ্য দিয়ে চলে যায়, অথচ তাদের শনাক্ত করা অত্যন্ত কঠিন। পদার্থবিদদের বহুকালের ধারণা, নিউট্রিনোর কোনো ভর নেই। কিন্তু ১৯৯৮ সালে জাপানের সুপার কামিওকান্দে পরীক্ষায় এক তাৎপর্যপূর্ণ ভিন্নধর্মী প্রমাণ পাওয়া যায়। নিউট্রিনোর প্রকৃতি সম্পর্কে ধারণা বদলে দেওয়ার জন্য সেই প্রমাণই যথেষ্ট। সে একেবারে পদার্থবিদ্যার মান্য মডেলের বাইরের ধারণা।

কী এই বিশেষ পদার্থ নিউট্রিনো? ১৯৩০ সালে অস্ট্রিয়ান পদার্থবিদ ভলফগ্যাং পাউলি নিউট্রিনোর অস্তিত্বের প্রস্তাব করেন। তেজস্ক্রিয় বিটা ক্ষয়ের সময় শক্তির হিসাব মেলাতে গিয়ে তিনি এমন একটি অদৃশ্য কণার ধারণা দেন যেটি শক্তি ও ভরবেগের একটি অংশ বহন করে নিয়ে যায়। তার বেশ কয়েক বছর পর এনরিকো ফের্মি এই কণাটিকে নিউট্রিনো নাম দেন এবং দুর্বল নিউক্লীয় বলের তত্ত্বে এর ভূমিকা ব্যাখ্যা করেন।

নিউট্রিনোর বৈদ্যুতিক আধান নেই, কোনো পদার্থের সঙ্গে তাদের সংযোজিত হওয়ার ক্ষমতা অত্যন্ত দুর্বল। তাই ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা সরাসরি নিউট্রিনো শনাক্ত করতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত পারমাণবিক চুল্লির কাছে সংঘটিত একটি ভূগর্ভস্থ পরীক্ষায় প্রথম নিউট্রিনো শনাক্ত করা হয়। তবে নিউট্রিনোর কারখানা শুধু পারমাণবিক চুল্লি নয়। সূর্যের নিউক্লীয় সংযোজন, মহাজাগতিক রশ্মি এবং সুপারনোভার মতো মহাজাগতিক ঘটনাও বিপুল সংখ্যায় নিউট্রিনো তৈরি করে।

১৯৬৮ সালে হোমস্টেক এক্সপেরিমেন্ট সূর্য থেকে আসা নিউট্রিনো শনাক্ত করতে শুরু করে। এর মাধ্যমে সূর্যের শক্তির উৎস যে নিউক্লীয় সংযোজন, তার প্রমাণ পাওয়া যায়। কিন্তু দেখা গেল, হিসাবটা ঠিক মিলছে না। সূর্য থেকে পৃথিবীতে যত নিউট্রিনো পৌঁছানোর কথা, পরীক্ষায় তার অর্ধেকেরও কম ধরা পড়ছে। এখন কথা হচ্ছে, নিউট্রিনোগুলো কি তাহলে মাঝপথে হারিয়ে যাচ্ছে? এই গরমিলের রহস্যই পরিচিত হয়ে ওঠে ‘সোলার নিউট্রিনো প্রবলেম’ নামে।

এরপর বিজ্ঞানীরা অনেক ভেবে সিদ্ধান্তে এলেন যে নিউট্রিনো হয়তো হারিয়ে যাচ্ছে না, বরং পথ চলতে চলতে নিজের ধরন বদলে ফেলছে। সাধারণত নিউট্রিনোর পরিচিত ধরন তিনটি – ইলেকট্রন নিউট্রিনো, মিউঅন নিউট্রিন এবং টাউ নিউট্রিনো। এক ধরনের নিউট্রিনোর অন্য ধরনের নিউট্রিনোতে রূপান্তরিত হওয়ার এই ঘটনাকে বলা হয় ‘নিউট্রিনো অসিলেশন’ । অনেক সময় একটি ধরন অন্য ধরনে রূপান্তরিত হলে কোনো নির্দিষ্ট পরীক্ষায় সেটিকে আর শনাক্ত করা নাও যেতে পারে। কিন্তু এই ধারণার মধ্যেই ছিল আরও বড় চমক।

১৯৯৬ সালে জাপানে চালু হলো সুপার-কামিওকান্দে। পাহাড়ের গভীরে স্থাপিত এই বিশাল নিউট্রিনো ডিটেক্টরে রয়েছে প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ গ্যালন অতিশুদ্ধ জল এবং দেয়ালে বসানো আছে প্রায় ১৩,০০০ আলোক-গুণক নল । নিউট্রিনো সাধারণত জল ভেদ করে চলে যায়। কিন্তু খুব বিরল কোনো কোনো ক্ষেত্রে একটি নিউট্রিনো জলের অণুর সঙ্গে সংঘর্ষ করলে একটা ক্ষীণ নীল আলো তৈরি হয়। এই আলোকে বলা হয় ‘চেরেনকভ বিকিরণ’। সেন্সরগুলো সেই ক্ষীণ আলোর বলয় বিশ্লেষণ করেই নিউট্রিনোর গতিপথ ও ধরন সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে।

তাকাকি কাজিতা ও তাঁর সহকর্মীরা প্রথম দুই বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করে একটা তাৎপর্যপূর্ণ পার্থক্য দেখতে পেলেন। ঊর্ধ্ব বায়ুমণ্ডল থেকে আসা মিউঅন নিউট্রিনোর সংখ্যা ছিল পৃথিবীর ভেতর দিয়ে দীর্ঘ পথ পেরিয়ে নীচ থেকে আসা মিউঅন নিউট্রিনোর তুলনায় অনেক বেশি। অর্থাৎ, যত দীর্ঘ পথ নিউট্রিনো অতিক্রম করেছে, তত বেশি তার ধরন বদলানোর সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। অন্যদিকে ইলেকট্রন নিউট্রিনোর ক্ষেত্রে কিন্তু একই ধরনের পরিবর্তন দেখা যায়নি।

এটাই ছিল নিউট্রিনো অসিলেশনের প্রথম শক্তিশালী পরীক্ষামূলক প্রমাণ, যা থেকে প্রথম নিশ্চিতরূপে বোঝা গেল নিউট্রিনোর ভর আছে । কারণ, নিউট্রিনো অসিলেশন সম্ভব হওয়ার জন্য নিউট্রিনোর ভর শূন্যের চেয়ে বেশি হতে হবে। ১৯৯৮ সালের আগস্টে গবেষণাটি ফিজিক্যাল রিভিউ লেটার্সে (পি আর এল) প্রকাশিত হয়। অর্থাৎ, নিউট্রিনো সম্পূর্ণ ভরহীন, দীর্ঘদিনের এই প্রচলিত ধারণা ভুল। পরে ২০০০ সালে টাউ নিউট্রিনোর অস্তিত্ব নিশ্চিত হয়। ২০০১ সালে কানাডার Sudbury Neutrino Observatory (SNO) সূর্যের নিউট্রিনো নিয়ে আরও শক্তপোক্ত প্রমাণ মিলল। জানা গেল, সূর্য থেকে আসা ইলেকট্রন নিউট্রিনোর একটি বড় অংশ পৃথিবীতে পৌঁছানোর আগেই অন্য ধরনের নিউট্রিনোতে রূপান্তরিত হয়। এবং তিন ধরনের নিউট্রিনো একসঙ্গে হিসাব করলে তার মোট সংখ্যা তাত্ত্বিক পূর্বাভাসের সঙ্গে মিলে যায়। মোদ্দাকথা। নিউট্রিনোরা কোথাও হারিয়ে যায় না, শুধু নিজেদের পরিচয় বদলে ফেলে।

নিউট্রিনোর এই অসিলেশন এবং ভরের প্রমাণের জন্য তাকাকি কাজিতা ও আর্থার ম্যাকডোনাল্ড ২০১৫ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পান। নিউট্রিনোর ভর আবিষ্কার পদার্থবিদ্যার প্রচলিত মান্য মডেলকে একটা বড় প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছিল। কারণ মান্য মডেলের মূল কাঠামো অনুযায়ী নিউট্রিনো তো ভরহীন!

তবে এই আবিষ্কার যত না উত্তর দিয়েছে তার চেয়ে যেন বেশি প্রশ্ন তৈরি করেছে। যেমন নিউট্রিনো তার এই সামান্য ভর পেল কোথা থেকে? তিন ধরনের নিউট্রিনোর ভর কি একই, নাকি আলাদা? নিউট্রিনো ও অ্যান্টিনিউট্রিনোর আচরণ কি এক? তাদের মধ্যে কোনো মৌলিক পার্থক্য কি মহাবিশ্বে পদার্থ ও প্রতিপদার্থের অসমতা তৈরির রহস্য ব্যাখ্যা করতে পারে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতেই এগিয়ে চলেছে পরবর্তী প্রজন্মের নিউট্রিনো পরীক্ষা হাইপ্র- কামিওকান্দে ও DUNE.

 

১৯৯৮ সালের সুপার-কামিওকান্দের আবিষ্কার শুধু নিউট্রিনোর একটি নতুন বৈশিষ্ট্যই প্রকাশ করেনি, আলোকপাত করেছে মহাবিশ্বের সবচেয়ে অধরা ও ক্ষীণ-আন্তঃক্রিয়াশীল কণাগুলোর মধ্যে লুকোনো পদার্থবিদ্যার নতুন নিয়মকে। যে কণা প্রতি মুহূর্তে আমাদের শরীর ভেদ করে চলে যায়, অথচ তাকে আমরা প্রায় দেখতেই পাই না!

কিন্তু সেই অদৃশ্য নিউট্রিনোই শেষ পর্যন্ত বিজ্ঞানীদের জানান দিল, মহাবিশ্বকে জানার/বোঝার প্রায়াস আমাদের এখনও সম্পূর্ণ নয়।

 

সূত্র: https://www.aps.org/apsnews/2026/08/scientists-publish-evidence-neutrinos-oscillate

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

seventeen + 11 =