পরজীবী-প্রতিরোধী ঝিনুক  

পরজীবী-প্রতিরোধী ঝিনুক  

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২৩ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬

ঝিনুক জল ছেঁকে শৈবাল ও অতিরিক্ত পুষ্টি সংগ্রহ করে। এর সাথেই তারা সমুদ্রের রোগজীবাণু কমাতেও সাহায্য করে। উইলিয়াম অ্যান্ড মেরি বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাটেন স্কুল অব কোস্টাল অ্যান্ড মেরিন সায়েন্সেস অ্যান্ড ভার্জিনিয়া ইনস্টিটিউট অব মেরিন সায়েন্স- এর একটি গবেষণা বলছে, জীবন্ত ঝিনুক আশপাশের সামুদ্রিক প্রাণীদের মধ্যে রোগ সংক্রমণ প্রতিরোধ করতে পারে। বিশেষ করে চেসাপিক উপসাগরের মূল্যবান নীল কাঁকড়াদের ক্ষেত্রে এই প্রভাব স্পষ্টভাবে লক্ষ্য করা গেছে। ঝিনুকের এই সক্রিয় ‘ফিল্টার-ফিডিং’ প্রক্রিয়া মারাত্মক পরজীবী হেমাটোডিনিয়াম পেরেজি-এর সংক্রমণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দেয়। এই পরজীবী সাধারণত উচ্চ-লবণাক্ত উপকূলীয় জলে কিশোর নীল কাঁকড়াদের সংক্রমিত করে এবং অনেক ক্ষেত্রে মৃত্যু ডেকে আনে। ভার্জিনিয়ার পূর্ব উপকূলীয় অঞ্চলে বহিরঙ্গন পরীক্ষায় দেখা যায়, জীবন্ত ঝিনুকের কাছে রাখা কিশোর কাঁকড়াগুলির সংক্রমণের সম্ভাবনা প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কম। সেই তুলনায় ঝিনুক ছাড়া কাঁকড়াদের সংক্রমনের হার ছিল বেশি। গবেষক জেফ্রি শিল্ডস জানান, “ঝিনুক ও ঝিনুক-প্রাচীর যে পরিবেশগত নানা উপকার করে, তা আগে থেকেই জানা ছিল। কাঁকড়ারা সেখানে খাদ্য ও আশ্রয়ের জন্য ভিড় করে। কিন্তু ঝিনুক যে জল থেকে রোগজীবাণু সরাতে পারে এই দিকটি আগে তেমনভাবে পরীক্ষা করা হয়নি”। গরমের সময়, যখন পরজীবীর সংক্রমণ সবচেয়ে বেশি হয়, তখন গবেষকেরা উচ্চ-লবণাক্ত উপসাগরে সংক্রমণহীন কিশোর কাঁকড়াগুলিকে ছেড়ে দেন। কিছু কাঁকড়াকে জীবন্ত ঝিনুকদের মাঝে আর কিছু কাঁকড়াকে ঝিনুকের খালি খোলসের মাঝে, আর কিছুকে একেবারে উন্মুক্ত অবস্থায় রাখা হয়। দেখা যায় শুধু জীবন্ত ঝিনুকের উপস্থিতিতেই সংক্রমণ কমেছে। ল্যাবরেটরিতেও একই ফল পাওয়া যায়। যখন ঝিনুককে পরজীবী সংক্রামক মুক্ত-ভাসমান স্তর—ডাইনোস্পোর—এর সংস্পর্শে আনা হয়, তারা দ্রুত সেগুলোকে জল থেকে ছেঁকে ফেলে। ঝিনুকগুলো গড়ে এক ঘণ্টার মধ্যে ৬০ শতাংশের বেশি পরজীবী সরিয়ে দেয়। এই হার অন্য প্ল্যাঙ্কটন অপসারণের সমতুল্য। গবেষকেরা আরও লক্ষ্য করেন, ঝিনুক-সংলগ্ন দলে কাঁকড়ার মৃত্যুহারও কিছুটা কমেছে। যদিও তাঁরা সতর্ক করে বলেছেন, এই ফল সরাসরি ঝিনুকের কারণেই হয়েছে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে আরও বিশ্লেষণ প্রয়োজন। এই পরজীবী সংক্রমণ গ্রীষ্মকালে কিশোর নীল কাঁকড়ার ব্যাপক মৃত্যু ঘটাতে পারে। কিছু উচ্চ-লবণাক্ত উপসাগরে তো সংক্রমণের হার প্রায় ১০০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছায়। গবেষকেরা প্রথমে ভেবেছিলেন, সবচেয়ে ছোট কাঁকড়ারাই বেশি আক্রান্ত হবে। কিন্তু দেখা গেল, অপেক্ষাকৃত বড় কিশোর কাঁকড়াদের মধ্যেও নতুন সংক্রমণের হার বেশি। এই তথ্য অর্থনৈতিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। প্রতি বছর মৎস্যশিল্প প্রায় ৪০ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক কাঁকড়া ধরে। সেই ঘাটতি পূরণ করতে কিশোর কাঁকড়াদের দ্রুত বড় হতে হয়। কিন্তু যদি তারাই বেশি সংক্রমিত হয়, তাহলে সামগ্রিক জনসংখ্যা ও মৎস্যসম্পদ উভয়ই চাপে পড়তে পারে। গবেষণা দলের মতে, সমুদ্রের রোগের গতিপ্রকৃতি নিয়ে আরও মনোযোগ দেওয়া জরুরি। কারণ সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র জটিল, আর সেখানে রোগের প্রভাব সরাসরি মৎস্যসম্পদ ও অর্থনীতিকে প্রভাবিত করতে পারে। সব মিলিয়ে, এই গবেষণা ঝিনুককে নতুন আলোয় দেখার সুযোগ দিচ্ছে। ঝিনুকদের এই কাজই ভবিষ্যতে উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্র রক্ষায় বড় ভূমিকা নিতে পারে।

 

সূত্র: The Microbiologist; February, 2026

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

16 − 5 =