পরমাণু বোমা ও হান্স বেথের নৈতিক দ্বন্দ্ব 

পরমাণু বোমা ও হান্স বেথের নৈতিক দ্বন্দ্ব 

সুপর্ণা চট্টোপাধ্যায়
বিজ্ঞানভাষ সম্পাদকীয় বিভাগ
Posted on ২৭ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬

মানুষটি পরমাণু যুগের দরজা খুলতে সাহায্য করেছিলেন । তারপর জীবনের বাকি সময় কাটিয়েছেন সেই শক্তিকেই নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টায় । ১৯৪৩ সাল। যুক্তরাষ্ট্রের লস আলামোস গবেষণাগার অথবা লস আলামোস জাতীয় গবেষণাগার-এ গোপনে চলছে ‘ম্যানহাটান প্রকল্প’। এই প্রকল্পের তাত্ত্বিক বিভাগের নেতৃত্বে ছিলেন জার্মানি-জাত পদার্থবিদ হান্স বেথে। তাঁর কাজ ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গণনা করে নিশ্চিত করা, আদৌ পরমাণু বোমা কাজ করবে কি না। ইউরেনিয়াম বা প্লুটোনিয়াম এগুলি তো কেবল ধাতু। সঠিক গণনা, ক্রিটিক্যাল ভরের হিসাব, নিউট্রনের বিস্তার, বিস্ফোরণের শক্তি- এসব মিললে তবেই অস্ত্র কাজ করবে। বেথের সমীকরণ সেই সম্ভাবনাকেই বাস্তবে রূপ দেয়। তাঁর গণনা দেখায়, বিক্রিয়া মালা নিয়ন্ত্রণহীন হলে কী ভয়াবহ শক্তি বেরোতে পারে ।

বেথে ছিলেন ইহুদি বংশোদ্ভূত । ১৯৩৩ সালে নাৎসি শাসনের জাতি বিদ্বেষী আইনে চাকরি হারিয়ে জার্মানি ছাড়তে বাধ্য হন। আশঙ্কা , হিটলারের জার্মানি যদি আগে পরমাণু অস্ত্র বানিয়ে ফেলে! এ আশঙ্কা তাঁর কাছে ছিল ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক দুই-ই। সেই ভয়ই ম্যানহাটান প্রকল্পের নৈতিক ভিত্তি তৈরি করে। অনেক বিজ্ঞানীর মতো বেথেও মনে করতেন, পরমাণু বোমা একটা প্রতিরক্ষামূলক পদক্ষেপ। এর সাহায্যে শক্তির ভারসাম্য নষ্ট হওয়া ঠেকানো যাবে। ১৯৪৫ সালের ১৬ জুলাই, নিউ মেক্সিকো মরুভূমিতে সফল হল ‘ট্রিনিটি’ পরীক্ষামূলক বিস্ফোরণ। ফলাফল মিলে গেল তাত্ত্বিক পূর্বাভাসের সঙ্গে । কয়েক সপ্তাহ পর হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে বোমা নিক্ষেপে বিশ্ব বুঝে গেল সেই শক্তির প্রকৃত রূপ কী। সমীকরণ কাজ করেছে। কিন্তু তার মানবিক মূল্য অকল্পনীয়। ততদিনে জার্মানি আত্মসমর্পণ করেছে। অর্থাৎ যে আশঙ্কা থেকে ম্যানহাটান প্রকল্পের জন্ম, তা আর নেই। তখন বিজ্ঞানী বেথের কাছে নৈতিক প্রশ্ন একটা নতুন রূপ নিল। ফ্যাসিবাদ ঠেকানোর যুক্তি রূপান্তরিত হল ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায়। তিনি নীরব থাকেননি। বরং পরবর্তী অস্ত্র প্রতিযোগিতা নিয়ে প্রকাশ্যে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেন। ১৯৫০ সালে যুক্তরাষ্ট্র যখন আরও শক্তিশালী তাপ-নিউক্লীয় হাইড্রোজেন বোমা তৈরির কথা ভাবছে, বেথে তার বিরোধিতা করেন। এক বহুলপঠিত প্রবন্ধে তিনি প্রশ্ন তোলেন, মানবসভ্যতা কি এমন অস্ত্র তৈরি করবে যা সম্পূর্ণ ধ্বংস ডেকে আনতে পারে? তিনি সতর্ক করেন, এই অস্ত্র সাধারণ নাগরিকদের ব্যাপক হত্যাকে স্বাভাবিক করে তুলবে। তবে ঠান্ডা যুদ্ধের বাস্তবতা ছিল জটিল। সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের উত্তেজনা বাড়তে থাকায় বেথে শেষ পর্যন্ত হাইড্রোজেন বোমা প্রকল্পে যুক্ত হন। তাঁর যুক্তি ছিল বাস্তববাদী: অস্ত্রটি যেহেতু বানানো হবেই, তাই অন্তত তিনি ভিতর থেকে দায়িত্বশীল নজরদারি নিশ্চিত করতে পারবেন, সংযমের পক্ষে কথা বলতে পারবেন। পরে তিনি স্বীকার করেন, সিদ্ধান্তটি ছিল দ্বন্দ্বপূর্ণ। হাইড্রোজেন বোমা তৈরি হল । অস্ত্র প্রতিযোগিতা দ্রুতগতিতে এগোল।

এরপরের পাঁচ দশক বেথে কাটালেন অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ও বৈজ্ঞানিক দায়িত্ব নিয়ে কাজ করে। তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্টদের উপদেষ্টা ছিলেন, ১৯৬৩ সালের আংশিক পারমাণবিক পরীক্ষা নিষিদ্ধ চুক্তিকে সমর্থন করেন, এবং সামরিক আগ্রাসী নীতির সমালোচনা করেন। ১৯৫৪ সালে নিরাপত্তা শুনানিতে জে. রবার্ট ওপেনহাইমার-এর পক্ষে সাক্ষ্য দেন। ১৯৯৫ সালে, ৮৮ বছর বয়সে, তিনি একটি আন্তর্জাতিক আবেদনপত্রে সই করেন। তাতে বিজ্ঞানীদের আহ্বান জানানো হয়, ভবিষ্যতে যেন কোনো গণবিধ্বংসী অস্ত্র তৈরিতে তারা অংশ না নেন। বেথে কখনও নিজের ভূমিকা অস্বীকার করেননি। তিনি জানতেন, তিনিই পরমাণু যুগের গণিতকে দৃঢ় ভিত্তি দিয়েছেন। তবে তাঁর উত্তরাধিকার শুধু ওই তাত্ত্বিক সাফল্যে সীমাবদ্ধ নয়। নক্ষত্র কীভাবে শক্তি উৎপাদন করে, এই ব্যাখ্যার জন্য তিনি নোবেল পুরস্কার পান। ওদিকে সমান গুরুত্বপূর্ণ ছিল তাঁর নৈতিক অবস্থানও। তিনি বুঝেছিলেন, জ্ঞান একবার সৃষ্টি হলে তা মুছে ফেলা যায় না। প্রশ্ন হল, তা কীভাবে নিয়ন্ত্রিত হবে? সমীকরণ নিখুঁত হতে পারে, কিন্তু তার প্রয়োগ হতে হবে মানবিক দায়কে মাথায় রেখেই।

 

সূত্র: Physics FB page

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

3 × two =