পানীয় জলে মিশছে বিষাক্ত ধাতু 

পানীয় জলে মিশছে বিষাক্ত ধাতু 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ৪ নভেম্বর, ২০২৬

নরওয়ের স্ভালবার্ড দ্বীপপুঞ্জের প্রত্যন্ত সুমেরীয় জনপদ লংইয়ারবিয়েনে প্রায় ২,৬০০ মানুষের বসবাস। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এই জনপদের বাসিন্দাদের কাছে এখন কলের জল পান বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। একসময় এখানে পানীয় জলের প্রধান উৎস ছিল ২.৫ কিলোমিটার দীর্ঘ বাঁধ দিয়ে ঘেরা ইসডামেন হ্রদ। কিন্তু ক্রমবর্ধমান উষ্ণতার কারণে সেই হ্রদের জল আজ এতোটাই দূষিত যে, সে জল বিষতুল্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিশ্বের গড় উষ্ণায়নের তুলনায় স্ভালবার্ড অঞ্চলের তাপমাত্রা প্রায় পাঁচ থেকে সাত গুণ দ্রুত বাড়ছে। এর ফলে মাটির গভীরে বছরের পর বছর জমে থাকা বরফের স্তর, অর্থাৎ পারমাফ্রস্ট, গলতে শুরু করেছে। পারমাফ্রস্ট গলে যাওয়ায় আগে বরফের নীচে চাপা পড়ে থাকা শিলাস্তর উন্মুক্ত হয়ে পড়ছে। এই শিলার মধ্যে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে পাইরাইট নামের খনিজ, যেটির রাসায়নিক নাম আয়রন সালফাইড।

জল ও অক্সিজেন পাইরাইটের সংস্পর্শে এলে রাসায়নিক বিক্রিয়া শুরু হয়। ফলে অ্যাসিড তৈরি হয়, যা আশপাশের শিলা থেকে ম্যাঙ্গানিজ, নিকেলসহ বিভিন্ন ভারী ধাতু বের করে এনে জলের সঙ্গে মিশিয়ে দেয়। এভাবেই দূষিত হয়ে পড়ছে ইসডামেন হ্রদের জল।

২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে হ্রদের জলে ম্যাঙ্গানিজের মাত্রা বিপজ্জনকভাবে বেড়ে যায়। এর ঘনত্ব পৌঁছেছিল প্রতি লিটারে ৫০ মাইক্রোগ্রামের নিরাপদ সীমার ২৫ গুণে। এই সীমা নির্ধারণ করেছে নরওয়ের জনস্বাস্থ্য সংস্থা। পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে প্রশাসন বাসিন্দাদের কলের জল পান না করার সতর্কবার্তা জারি করে। পরবর্তী সময়ে ম্যাঙ্গানিজের মাত্রা কিছুটা কমলেও জলে সালফেট ও নিকেলের উপস্থিতি এখনও নিরাপদ মাত্রার ওপরে। তাই পানীয় জল হিসেবে কলের জল ব্যবহারের নিষেধাজ্ঞা এখনও বহাল।

দীর্ঘদিন অতিরিক্ত ম্যাঙ্গানিজযুক্ত জল পান করলে মানুষের স্নায়ুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি বেশি। আপাতত বাসিন্দাদের জন্য বিশুদ্ধ পানীয় জলের ব্যবস্থা করা হয়েছে। স্থানীয় একটি মদ্য কারখানা থেকে জল পরিশোধন করে একটি কেন্দ্রীয় ট্যাঙ্কে জমা রাখা হচ্ছে, যেখান থেকে মানুষ জল সংগ্রহ করছেন।

স্ভালবার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক মারজোলাইন ভেরেট-সহ বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, এই দূষণে জলবায়ু পরিবর্তন ও বরফের স্তর/ পার্মাফ্রস্ট গলে যাওয়ার সরাসরি সম্পর্কিত। তাঁদের আশঙ্কা, একই ধরনের ভূতাত্ত্বিক গঠন এবং দ্রুত উষ্ণায়নের প্রভাবযুক্ত অন্যান্য সুমেরীয় জনপদেও ভবিষ্যতে একই বিপদ দেখা দিতে পারে।

দূষণমুক্ত জলের স্থায়ী ব্যবস্থা গড়ে তুলতে উন্নত জল পরিশোধন প্রযুক্তি বা সমুদ্রের জল লবণমুক্ত করার পদ্ধতি ব্যবহার করা যেতেই পারে। কিন্তু ওখানকার প্রচণ্ড ঠান্ডা, দুর্গম পরিবেশ এবং বিপুল খরচের কারণে এই সমাধানগুলি বাস্তবায়ন করা কঠিন।

লংইয়ারবিয়েনের এই ঘটনা দেখিয়ে দিচ্ছে, জলবায়ু পরিবর্তন শুধু হিমবাহ গলানো বা সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। মাটির নীচে জমে থাকা ক্ষতিকর পদার্থকে মুক্ত করে তা মানুষের দৈনন্দিন পানীয় জলের উৎসকেও বিপজ্জনক করে তুলতে পারে। অর্থাৎ, বিশ্ব উষ্ণায়নের প্রভাব এখন সরাসরি মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্যের উপর এসে পড়ছে।

 

সূত্র: The Guardian, “Tap water no longer drinkable in Norwegian village as climate-related thawing releases heavy metals,” October 2026.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

20 − thirteen =