পায়রাকে পথ চেনায় লিভারের চৌম্বক কোষ 

পায়রাকে পথ চেনায় লিভারের চৌম্বক কোষ 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১৬ আগষ্ট, ২০২৬

দূর অচেনা স্থান থেকে ছেড়ে দিলেও পায়রারা একেবারে নির্ভুলভাবে নিজের ঘরে ফিরে আসে। কীভাবে এই যাত্রা এতো সফলভাবে সম্ভব হতে পারে ? সেই নিয়ে বিগত কয়েক দশক ধরেই প্রাণীবিজ্ঞানীদের মনে একটা প্রশ্ন খুব ঘন ঘনই উঁকি দিচ্ছে। পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্র ব্যবহার করে পথ নির্ধারণ করতে পারে, এমন ধারণা অনেক প্রাণী সম্বন্ধেই রয়েছে। কিন্তু কথা হল, সেই চৌম্বক সংকেত তারা শরীরের ঠিক কোন অংশ দিয়ে শনাক্ত করে? এই বিষয় নিয়ে ধারণাটা খুব একটা স্পষ্ট ছিল না। সাম্প্রতিক একটি গবেষণা এবার সেই রহস্যভেদ করলো। এই গবেষণাটি বিস্তারিতভাবে প্রকাশিত হয়েছে সায়েন্স জার্নালে।

জার্মানির ইউনিভার্সিটি অব বন-এর গবেষক ক্লিভিয়া লিসোভস্কির নেতৃত্বে পরিচালিত হয়েছে এই গবেষণা। দেখা গেছে, পায়রার লিভারে থাকা বিশেষ ধরনের শ্বেত রক্তকণিকা ম্যাক্রোফাজ-এর মধ্যে চৌম্বক বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এই কোষগুলো সাধারণত শরীরের ক্ষতিকর জীবাণু, মৃত কোষ ও অন্যান্য বর্জ্য পদার্থ গ্রাস করে ধ্বংস করার কাজ করে। কিন্তু, গবেষকদের মতে, একই সঙ্গে পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্র অনুভব করার ক্ষমতাও এধরণের কোষে বিদ্যমান।

পায়রার লিভার থেকে শুরু করে প্লীহা, পেশি ও ঠোঁট প্রভৃতির বিভিন্ন কোষকলা বিশ্লেষণ করেছেন তাঁরা। কোষের চৌম্বক বৈশিষ্ট্য শনাক্ত করতে তারা ভাইব্রেটিং-স্যাম্পল ম্যাগনেটোমেট্রি (VSM) নামক পদ্ধতি ব্যবহার করেন। এর পাশাপাশি পায়রার উড়ানের ধরন পর্যবেক্ষণ, উড়ান- পেশির সূক্ষ্ম গঠন বিশ্লেষণ এবং জিনগত পরীক্ষাও চালানো হয়।

এই বহুস্তর বিশ্লেষণে পায়রার লিভারে পাওয়া যায় সুপারপ্যারাম্যাগনেটিক ম্যাক্রোফেজ। সুপারপ্যারাম্যাগনেটিজম/অতি-প্যারাচুম্বকত্ব হল এমন একধরণের বৈশিষ্ট্য, যেখানে কোনো পদার্থ বাহ্যিক চৌম্বকক্ষেত্রের প্রভাবে খুব সহজে চুম্বকীয় হয়ে উঠতে পারে। এই বৈশিষ্ট্যের উৎসও বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। পুরোনো ক্ষতিগ্রস্ত লোহিত রক্তকণিকা ভেঙে ফেলার সময় ম্যাক্রোফেজগুলো তাদের ভিতর থেকে লোহা সংগ্রহ করে। সেই লোহা ফেরিটিন নামের প্রোটিনের মধ্যে অক্সাইড ন্যানোকণিকা হিসেবে জমা থাকে। গবেষকদের ধারণা, এই লৌহসমৃদ্ধ ন্যানোকণিকাই কোষগুলোকে চৌম্বক সংবেদিতা দিতে পারে।

এই গবেষণার আরও গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হলো, লিভারের এই ম্যাক্রোফাজগুলোর মধ্যে অনেকগুলোরই অবস্থান স্নায়ুতন্তুর খুব কাছাকাছি। কিছু ক্ষেত্রে তাদের সঙ্গে স্নায়ুতন্তুর সরাসরি সংযোগও দেখা গেছে। ফলে বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, লিভারের এই কোষগুলো পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্রের পরিবর্তন শনাক্ত করে সেই তথ্য স্নায়ুতন্ত্র মারফত মস্তিষ্কে পাঠাতে পারে।

গবেষকরা আরও একটি সম্ভাব্য আণবিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন। ফেরিটিনে থাকা জোড়াবিহীন ইলেকট্রনগুলোর মধ্যে চৌম্বক মিথস্ক্রিয়া কোষগুলোর চৌম্বক সংবেদিতা বাড়াতে পারে। এমনকি উড়ান শুরুর পর পায়রার বৃত্তাকারে ঘোরার স্বাভাবিক আচরণও সম্ভবত এই চৌম্বক তথ্য সংগ্রহ বা নির্ধারণ-এর সঙ্গে যুক্ত।

তবে এই গবেষণার ফলাফল থেকে এখনও চূড়ান্তভাবে বলা যায় না যে, পায়রা কেবল লিভারের ম্যাক্রোফেজ ব্যবহার করেই দিক নির্ধারণ করে। তবে এটি ম্যাগনেটো-রিসেপশন (চৌম্বক গ্রাহী ধর্ম) নিয়ে একটি নতুন সম্ভাব্য পথ তুলে ধরেছে। একই সঙ্গে গবেষণাটি রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার ধারণাকেও নতুনভাবে ফুটিয়ে তুলেছে। পরিবেশের রাসায়নিক সংকেতের পাশাপাশি চৌম্বক তথ্যও অনাক্রম্য কোষের আচরণে কোনো ভূমিকা পালন করে কি না, এখন সেটিই হতে পারে ভবিষ্যতের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

সূত্রঃ: Pigeons’ immune system can sense Earth’s magnetic field, study suggests – Physics World

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

5 × 3 =