পারমাণবিক বর্জ্য ও জাপান 

পারমাণবিক বর্জ্য ও জাপান 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১৯ মার্চ, ২০২৬

পৃথিবী আবার ধীরে ধীরে পারমাণবিক শক্তির দিকে ফিরছে। কয়লা আর তেলের ধোঁয়াটে যুগ থেকে বেরিয়ে এসে অনেক দেশই এখন ভাবছে, নিউক্লিয়ারই কি ভবিষ্যতের বিদ্যুৎ সমাধান? কিন্তু এই শক্তির সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক ভয়ংকর বাস্তবতা। তেজস্ক্রিয় বর্জ্য। বিদ্যুৎ তো পাওয়া যাবে কিন্তু সেই মারাত্মক বর্জ্য রাখা হবে কোথায়? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে জাপান এখন তাকিয়ে আছে তারই এক বিস্মৃত ভূ-খণ্ড মিনামিতোরিশিমার দিকে। প্রশান্ত মহাসাগরের বুকের উপর একটি ক্ষুদ্র ত্রিভুজাকার দ্বীপ। আয়তন মাত্র ০.৬ বর্গমাইল। টোকিও থেকে প্রায় ১,২৫০ মাইল দূরে, একেবারে জাপানের পূর্বসীমার শেষ প্রান্তে অবস্থিত। দ্বীপটিকে ঘিরে আছে প্রবাল অ্যাটল। সাধারণ মানুষের প্রবেশ সেখানে নিষিদ্ধ। যেন মানচিত্রের কিনারায় পড়ে থাকা এক নিঃসঙ্গ বিন্দু। জাপানের অর্থনীতি, বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী রিওসেই আকাজাওয়া সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, এই দ্বীপে এখনও অনেক ‘না খোঁজা’ এলাকা রয়েছে। সেখানে তেজস্ক্রিয় বর্জ্য সংরক্ষণের অবকাঠামো তৈরি করা যেতে পারে। তাঁর কথায়, দ্বীপটির ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যও বৈজ্ঞানিকভাবে অনুকূল। কিন্তু এই প্রস্তাব যতটা বৈজ্ঞানিক, ততটাই বিতর্কিত। কারণ পারমাণবিক শক্তির ইতিহাস কখনই পুরোপুরি নিরাপদ ছিল না। ২০১১ সালে ফুকুশিমা পারমাণবিক দুর্ঘটনা, জাপানের উপকূলে ভয়ংকর বিপর্যয় ঘটিয়েছিল। এর পর বিশ্বের সবচেয়ে বড় পারমাণবিক বিপর্যয় হল চেরনোবিল পারমাণবিক দুর্ঘটনা। সেই স্মৃতি য জাপানের সমাজ ও রাজনীতিতে গভীর দাগ রেখে গেছে। তবু এই জলবায়ু সংকটের যুগে, কার্বন নিঃসরণ কমাতে গিয়ে অনেক দেশ আবার পারমাণবিক শক্তির কথা ভাবছে। কয়লার বিকল্প দরকার, আর নবায়নযোগ্য শক্তি এখনও সবসময় স্থিতিশীল নয়। ফলে পারমাণবিক বিদ্যুৎ অনেকের কাছে আবার আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে। ২০২৩ সালের একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৫৫ শতাংশ মানুষ, পারমাণবিক শক্তির ব্যবহার বাড়ানোর পক্ষে। এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে মার্কিন পারমাণবিক নিয়ন্ত্রণ কমিশন ওয়াইওমিং-এ একটি ৩৪৫ মেগাওয়াটের উন্নত পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র অনুমোদন করেছে। ২০৫০ সালের মধ্যে দেশটির পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় চার গুণ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। জাপানও পিছিয়ে থাকতে চায় না। ফুকুশিমার ভয়াবহ স্মৃতি সত্ত্বেও নতুন জ্বালানি নীতিতে তারা বলছে, পারমাণবিক শক্তির সর্বাধিক ব্যবহার করতে হবে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে জাপান আবার চালু করেছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, কাশিওয়াজাকি–কারিওয়া, যা ফুকুশিমার দুর্ঘটনার পর দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল। কিন্তু বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু করা যতটা সহজ, তার বর্জ্য সামলানো ততটাই কঠিন। পারমাণবিক বর্জ্য হাজার হাজার বছর ধরে বিপজ্জনক অবস্থায় থাকে। তাই সেটিকে এমন জায়গায় সমাধিস্থ করতে হয় যেখানে ভূমিকম্প, জলস্রোত বা মানব বসতি কোনো কিছুই ঝুঁকি তৈরি করবে না। এই কারণেই জাপান এখন মিনামিতোরিশিমার মতো দূরবর্তী দ্বীপের কথা ভাবছে। দ্বীপটি এতটাই বিচ্ছিন্ন যে কোনো দুর্ঘটনার প্রভাব মানুষের বসতিতে পৌঁছানোর সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে কম। তবে সিদ্ধান্ত এখনও চূড়ান্ত হয়নি। এর আগে জাপানের জনবহুল দ্বীপ হোক্কাইডো এবং কিউশুতেও তিনটি সম্ভাব্য স্থানে প্রাথমিক সমীক্ষা করা হয়েছে। মিনামিতোরিশিমা নিয়ে এখনও বিস্তারিত ভূ-তাত্ত্বিক ও পরিবেশগত গবেষণা বাকি। তবুও প্রশ্নটা রয়ে যায়, পারমাণবিক শক্তি কি সত্যিই সবুজ ভবিষ্যতের পথ, নাকি আমরা কেবল আরও এক দীর্ঘস্থায়ী সমস্যাকে পৃথিবীর কোনো দূরবর্তী কোণে চাপা দিতে চাইছি? প্রশান্ত মহাসাগরের সেই নিঃসঙ্গ দ্বীপ যেন আজ সেই প্রশ্নের নীরব সাক্ষী।

 

সূত্র: Poplular Science; March 2026

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

4 × 4 =