পার্কিনসন রোগের সঙ্গে আমাদের অন্ত্র এবং মস্তিষ্কের সম্পর্ক আছে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, অন্ত্রের কিছু নির্দিষ্ট জীবাণু (গাট মাইক্রোব) পার্কিনসন রোগের সঙ্গে জড়িত। এগুলো শরীরে রিবোফ্লাভিন (ভিটামিন B2) ও বায়োটিন (ভিটামিন B7)-এর মাত্রা কমিয়ে দেয়। সুতরাং সম্ভাব্য চিকিৎসা ভিটামিন বি সাপ্লিমেন্ট। জাপানের নাগোয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক হিরোশি নিশিওয়াকি বলেন, “রিবোফ্লাভিন ও বায়োটিন-নির্ভর সাপ্লিমেন্ট থেরাপি পার্কিনসনের উপসর্গ কমাতে এবং রোগের অগ্রগতি ধীর করতে এক সম্ভাবনাময় উপায় হতে পারে।‘’ পার্কিনসন একটি স্নায়ুক্ষয়জনিত রোগ, যা বিশ্বজুড়ে কোটিখানেক মানুষের উপর প্রভাব ফেলে। এই রোগের সম্পূর্ণ নিরাময় এখনও সম্ভব হয়নি। চিকিৎসার মূল লক্ষ্য থাকে, উপসর্গ কমানো ও রোগের অগ্রগতি ধীর করা। চিকিৎসার লক্ষণগুলো সাধারণত ধীরে ধীরে শুরু হয়। প্রথমে কোষ্ঠকাঠিন্য ও ঘুমের সমস্যা দেখা যায়। অনেক সময় ১৫–২০ বছর আগেই এগুলো শুরু হয়ে যায়। পরে তা ডিমেনশিয়া এবং পেশির নিয়ন্ত্রণ হারানোর মতো গুরুতর সমস্যায় রূপ নেয়। আগের গবেষণাগুলোতে দেখা গিয়েছিল, পার্কিনসন রোগীদের লক্ষণ প্রকাশের অনেক আগেই তাঁদের অন্ত্রের মাইক্রোবায়োমের পরিবর্তন শুরু হয়। নতুন গবেষণায়, জাপানের ৯৪ জন পার্কিনসন রোগী এবং ৭৩ জন সুস্থ মানুষের মল নমুনা বিশ্লেষণ করা হয়। পাশাপাশি চীন, তাইওয়ান, জার্মানি এবং যুক্তরাষ্ট্রের তথ্যের সঙ্গে তার তুলনা করা হয়। যদিও বিভিন্ন দেশে ব্যাকটেরিয়া ভিন্ন ধরনের, তবুও একটি সাধারণ বিষয় হল, ব্যাকটেরিয়া শরীরে ভিটামিন-বি তৈরির প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করছে। পার্কিনসন রোগীদের ক্ষেত্রে রিবোফ্লাভিন ও বায়োটিনের মাত্রা কমে গেছে। ভিটামিন বি-এর ঘাটতি শরীরে শর্ট-চেইন ফ্যাটি অ্যাসিড (SCFAs) এবং পলিআমিন নামক গুরুত্বপূর্ণ অণুর পরিমাণ কমিয়ে দেয়। অণুগুলো অন্ত্রের ভেতরে একটি সুরক্ষামূলক ঝিল্লি স্তর তৈরি করতে সাহায্য করে। যখন স্তরটি দুর্বল হয়ে যায়, তখন অন্ত্রের প্রাচীর পাতলা হয়ে পড়ে এবং এর ভেদ্যতা বেড়ে যায়। ফলে ক্ষতিকর রাসায়নিক সহজেই শরীরে প্রবেশ করতে পারে। এই অবস্থায় অন্ত্রের স্নায়ুতন্ত্র পরিবেশের বিভিন্ন বিষাক্ত পদার্থের সংস্পর্শে বেশি আসে। এসব বিষাক্ত পদার্থের মধ্যে রয়েছে সাফাই রাসায়নিক, কীটনাশক ও আগাছানাশক। এগুলো মস্তিষ্কে α-সিনিউক্লিন নামক প্রোটিনের অস্বাভাবিক জমাট বাঁধা (ফাইব্রিল) তৈরি করতে পারে। এই প্রোটিন জমে বিশেষ করে ডোপামিন উৎপাদনকারী কোষের (মস্তিষ্কের সাবস্ট্যানশিয়া নাইগ্রা অংশে) অবস্থিত। ফলে স্নায়ুতন্ত্রে প্রদাহ বাড়ে এবং ধীরে ধীরে পার্কিনসনের গুরুতর উপসর্গ দেখা দেয়। ২০০৩ সালের গবেষণায় দেখা গিয়েছিল, উচ্চ মাত্রার রিবোফ্লাভিন গ্রহণ করলে কিছু রোগীর মোটর ফাংশন বা চলাফেরার ক্ষমতা আংশিকভাবে উন্নত হতে পারে, বিশেষ করে যারা খাদ্যতালিকা থেকে লাল মাংস বাদ দিয়েছেন। তাই গবেষকরা মনে করছেন, উচ্চ মাত্রার ভিটামিন বি কিছু ক্ষেত্রে এই ক্ষতি কমাতে সহায়ক হতে পারে। আসলে সুস্থ গাট মাইক্রোবায়োম আমাদের সুরক্ষা দিতে পারে। পাশাপাশি পরিবেশে বিষাক্ত দূষণ কমানোও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সাম্প্রতিক গবেষণায় আরও দেখা গেছে, কিছু অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়া “ফরএভার কেমিক্যাল’’ নামে পরিচিত PFAS শোষণ করে নিজেদের মধ্যে জমা রাখতে পারে। ভবিষ্যতে এই ধরনের ব্যাকটেরিয়া বাড়ানো গেলে, এই ক্ষতিকর রাসায়নিকের প্রভাব কমানো সম্ভব হতে পারে। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, পার্কিনসন রোগের পেছনে একাধিক কারণ আছে। তাই সবার ক্ষেত্রে একই চিকিৎসা প্রযোজ্য নাও হতে পারে। নিশিওয়াকির মতে, “রোগীর গাট মাইক্রোবায়োম ও মল বিশ্লেষণ করে ব্যক্তিভিত্তিক ঘাটতি চিহ্নিত করা সম্ভব। এরপর প্রয়োজন অনুযায়ী রিবোফ্লাভিন ও বায়োটিন সাপ্লিমেন্ট দেওয়া হলে তা কার্যকর চিকিৎসা পদ্ধতি হয়ে উঠতে পারে”।
সূত্র: Science Alert; March 2026
