পূর্ব এশিয়ায় প্রযুক্তি-উন্নত প্রজাতির প্রমাণ 

পূর্ব এশিয়ায় প্রযুক্তি-উন্নত প্রজাতির প্রমাণ 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২৮ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬

সম্প্রতি চীনের হেনান প্রদেশের জিগৌ অঞ্চলে আবিষ্কৃত এক অসাধারণ প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন প্রাগৈতিহাসিক মানব উদ্ভাবন সম্পর্কে প্রতিষ্ঠিত ধারণাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। হেনান প্রদেশের এই স্থানে গবেষকেরা প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার বছর পুরোনো ২,৬০০–এরও বেশি পাথরের সরঞ্জাম উদ্ধার করেছেন। এর মধ্যেই রয়েছে পূর্ব এশিয়ায় এখন পর্যন্ত শনাক্ত সবচেয়ে প্রাচীন “হাফটিং” প্রযুক্তির প্রমাণ। হাফটিং-এর অর্থ হল, পাথরের ফলাকে কাঠের হাতল বা দণ্ডের সঙ্গে দৃঢ়ভাবে সংযুক্ত করার কৌশল। এই যৌগিক সরঞ্জাম মানব প্রযুক্তির ইতিহাসে এক মৌলিক অগ্রগতির ইঙ্গিত দেয়, কারণ এর ফলে কাজের সময় আরও বেশি বল প্রয়োগ, নিখুঁত নিয়ন্ত্রণ এবং দীর্ঘস্থায়ী ব্যবহার সম্ভব হয়েছিল।

এই “হাফটিং” কোনো আকস্মিক বা সরল উদ্ভাবন নয়; এটি বহুস্তর পরিকল্পনা ও কারিগরি দক্ষতার ফসল। প্রথমে পাথরের ফলাকে নির্দিষ্ট নকশায় ঘষে, ঘা দিয়ে গড়ে তুলতে হয়। তারপর উপযুক্ত কাঠ বা অন্য উপাদান বেছে নিয়ে হাতল প্রস্তুত করতে হয়। সবশেষে উদ্ভিজ্জ তন্তু, আঠালো পদার্থ বা অন্যান্য বাঁধাই উপকরণ দিয়ে দুই অংশকে এমনভাবে যুক্ত করতে হয়, যাতে বারবার আঘাতেও সংযোগ অটুট থাকে। এই সমন্বিত নির্মাণপ্রক্রিয়া দূরদৃষ্টি, উপাদান-জ্ঞান এবং কার্যকারণ বোঝার ক্ষমতার সাক্ষ্য বহন করে। ফলে “অপরিণত পাথরখণ্ডের যুগ” হিসেবে প্রাচীন পূর্ব এশিয়াকে দেখার যে সরলীকৃত ধারণা ছিল, তা থেকে মোড়টা এখানেই এসে ঘুরে গেল।

এই গবেষণায় সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ যে বিষয়টা উঠে এল সেটা হলো—এই সরঞ্জামগুলোর নির্মাতা কিন্তু আধুনিক মানুষ অর্থাৎ হোমো স্যাপিয়েন্স নয়। কারণ ঐ সময়ে আধুনিক মানুষের ওই অঞ্চলে বিস্তার ঘটেনি। গবেষকেরা সম্ভাব্য নির্মাতা হিসেবে উল্লেখ করছেন ডেনিসভান্স অথবা বিতর্কিত প্রজাতি হোমো লোঙ্গি–কে। সে পরিচয় যাই হোক না কেন, একটা বিষয় স্পষ্টভাবে প্রমাণিত যে পূর্ব এশিয়ার অন্য এক মানবগোষ্ঠীও উন্নত বোধবুদ্ধিগত সক্ষমতা ও প্রযুক্তিগত প্রজ্ঞার অধিকারী ছিল।

এই আবিষ্কার বহু আলোচিত “Movius Line” তত্ত্বের ভিত্তিকেও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। ওই তত্ত্ব অনুযায়ী, দীর্ঘদিন ধরে ধারণা ছিল, আফ্রিকা ও ইউরোপ প্রযুক্তিগতভাবে অগ্রসর হলেও পূর্ব এশিয়া ছিল তুলনামূলকভাবে স্থানু। কিন্তু শিগৌ–এর নিদর্শন দেখাচ্ছে, এখানে ছিল উদ্ভাবনী শক্তি, আচরণগত নমনীয়তা এবং সুপরিকল্পিত নকশা-চিন্তার উপস্থিতি।

মানব বিবর্তনের ইতিহাসকে নতুনকরে মূল্যায়নের দাবি তোলে এ গবেষণা। প্রমাণ করে যে প্রযুক্তিগত জটিলতার বিকাশ কোনো একক মানবপ্রজাতির একচেটিয়া সম্পদ ছিল না। মানব বুদ্ধিমত্তা ও উদ্ভাবনের ইতিহাস ছিল বহুমুখী ও ভৌগোলিকভাবে বিস্তৃত । মানব বংশলতিকা একাধিক শাখায় সমান্তরালভাবে বিকশিত। জিগৌ –এর এই আবিষ্কার একটা ব্যাপার স্পষ্ট করে আমাদের সামনে তুলে ধরল: যেকোনো উদ্ভাবনই বিশ্বব্যাপী, বহুমাত্রিক এবং বহুজাতিক মানব-ঐতিহ্যের অংশ।

 

সূত্র: Yue, J., et al. (2026). Technological innovations and hafted technology in central China ~160,000–72,000 years ago. Nature Communications.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

one × three =