পৃথিবীর ভেতরে লুকিয়ে আছে আরও বিশাল এক ভূগোল, যা এতদিন মানুষের চোখে পড়েনি। সম্প্রতি বিজ্ঞানীরা পৃথিবীর গভীর ম্যান্টলের মধ্যে লুকিয়ে থাকা দুটি মহাদেশ-আকারের অঞ্চল আবিষ্কার করেছেন। যেগুলোকে নতুন গবেষণায় বলা হচ্ছে “দ্বীপ’’। নেদারল্যান্ডসের ইউট্রেখট বিশ্ববিদ্যালয়–এর গবেষকরা জানাচ্ছেন, পৃথিবীর ভেতরের এই বিশাল অঞ্চলগুলো শুধু বিশালই নয়, আশ্চর্য রকম প্রাচীনও। অন্তত ৫০ কোটি বছর, কিংবা তারও অনেক বেশি সময় ধরে, এগুলি সেখানে স্থির হয়ে আছে। এই আবিষ্কার পৃথিবীর ভেতরের গতিপ্রকৃতি নিয়ে বহু পুরোনো ধারণাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। এই অদ্ভুত গঠনগুলো রয়েছে আমাদের পায়ের নীচে প্রায় ২০০০ কিলোমিটার গভীরে। উচ্চতায় এগুলো প্রায় ১০০০ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত, পৃথিবীর যেকোনো পর্বতের তুলনায় বহু গুণ বড়। তবে শুধু পৃথিবী কেন, পুরো সৌরজগতের কোনো গ্রহের পৃষ্ঠের পর্বতও বোধ হয় এত বিশাল নয়। অঞ্চল দুটি অবস্থান করছে আফ্রিকার নীচে এবং প্রশান্ত মহাসাগরের গভীরে। বিজ্ঞানীরা প্রথম এগুলোর অস্তিত্বের আভাস পান বিংশ শতাব্দীর শেষদিকে। বড় ভূমিকম্প হলে পৃথিবী যেন ঘণ্টার মতো কেঁপে ওঠে। এক ধরনের কম্পন সৃষ্টি হয়, যাকে সিসমোলজিস্টরা বিশ্লেষণ করে পৃথিবীর অভ্যন্তরের গঠন বোঝার চেষ্টা করেন। সেই বিশ্লেষণেই দেখা যায় অদ্ভুত কিছু অঞ্চল, যেখানে ভূকম্পীয় তরঙ্গ স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক ধীরে চলে। এই অঞ্চলগুলোকে বিজ্ঞানীরা নাম দিয়েছেন “বৃহৎ নিম্ন ভূকম্প তরঙ্গ-গতির অঞ্চল” সংক্ষেপে LLSVP। গবেষণার প্রধান লেখক ও ভূকম্পবিজ্ঞানী আরউইন ডেউস বলছেন, “এগুলো আসলে কি, তা নিয়ে এখনও নিশ্চিত কিছু বলা যায় না। এগুলো হয়তো সাময়িক কোনো গঠন বা হয়তো কোটি কিংবা তারও পুরনো কোন ভূ- গঠন, যা সেখানেই আছে।‘’এই রহস্যময় “দ্বীপ’’গুলোর চারপাশে রয়েছে পৃথিবীর আরেক অদ্ভুত অঞ্চল – এক ধরনের ভূতাত্ত্বিক কবরস্থান। পৃথিবীর টেকটোনিক প্লেটগুলো যখন একে অপরের নীচে ঢুকে যায়, সেই প্রক্রিয়াকে বলা হয় ‘সাবডাকশন/অধঃপ্রবেশ’। সেই ডুবে যাওয়া ঠান্ডা প্লেটগুলো ধীরে ধীরে ম্যান্টলের গভীরে নেমে গিয়ে জমা হতে থাকে। ফলে ঐ অঞ্চলে তৈরি হয় ঠান্ডা পাথরের স্তূপ। যাকে গবেষকরা কখনও কখনও “slab graveyard” বা চাঙড়ের কবরখানা বলেন। এই কবরখানার মাঝখানেই দাঁড়িয়ে আছে সেই দুই বিশাল ম্যান্টল দ্বীপ। গরম পাথরের মধ্যে দিয়ে ভূকম্প তরঙ্গ সাধারণত ধীরে চলে এবং শক্তি হারায়। তাই বিজ্ঞানীরা ধারণা করেছিলেন, LLSVP অঞ্চলেও একই ঘটনা ঘটবে। কিন্তু দেখা গেল সম্পূর্ণ উল্টো ছবি। সুজানিয়া তালাভেরা-সোসা–র নেতৃত্বে গবেষকরা শুধু তরঙ্গের গতি নয়, তার শক্তি কতটা হারায়, সেটিও বিশ্লেষণ করেন। এই শক্তি হারানোর প্রক্রিয়াকে বলা হয় “ড্যাম্পিং’’। দেখা যাচ্ছে, গরম হওয়া সত্ত্বেও LLSVP অঞ্চলে তরঙ্গের শক্তি খুব কমই হ্রাস পায়। যেন সেখানে কম্পন অনেক জোরে প্রতিধ্বনিত হয়। কিন্তু পাশের ঠান্ডা চাঙড়ের কবরখানায় ঠিক উল্টো। তরঙ্গ অনেক বেশি শক্তি হারায়, যেন শব্দ নরম হয়ে যায়। এই অদ্ভুত আচরণের ব্যাখ্যা খুঁজতে গিয়ে গবেষকরা তাকান পাথরের গঠনগত বৈশিষ্ট্যের দিকে। গবেষণার সহলেখক লরা কোবডেন–এর খনিজ বিশ্লেষণ দেখায়, এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে খনিজ দানার আকার। ডুবে যাওয়া টেকটোনিক প্লেটগুলো ম্যান্টলের গভীরে গিয়ে ছোট ছোট দানায় পুনর্গঠিত হয়। ফলে ভূ-কম্প তরঙ্গকে অনেক বেশি সীমানা অতিক্রম করতে হয়, আর তাতেই তা শক্তি হারায়। কিন্তু LLSVP অঞ্চলে খনিজ দানাগুলো অনেক বড়। ফলে তরঙ্গ প্রায় বাধাহীনভাবে এগিয়ে যেতে পারে। আর এখানেই লুকিয়ে আছে বয়সের সূত্র। কারণ খনিজ দানা এত বড় হতে হলে দীর্ঘ সময় লাগে। অর্থাৎ এই অঞ্চলগুলো আশপাশের প্লেট কবরখানার চেয়েও অনেক বড়। তাহলে LLSVP কি ম্যান্টলের সাধারণ প্রবাহের অংশই নয়? পৃথিবীর ম্যান্টলকে এতদিন বিজ্ঞানীরা এক ধরনের ধীরগতির ফুটন্ত তরলের মতো ভাবতেন, যেখানে পাথর ক্রমাগত ঘুরছে, মিশছে, পুনর্ব্যবহৃত হচ্ছে। কিন্তু এই বিশাল গঠনগুলো যেন সেই প্রবাহের মধ্যেই স্থির দ্বীপের মতো দাঁড়িয়ে আছে। তালাভেরা-সোসা বলেন, “এই অঞ্চলগুলো কোনোভাবে ম্যান্টলের প্রবাহের মধ্যেও টিকে থাকতে পারছে।“ এই আবিষ্কারের গুরুত্ব শুধু ভূগর্ভেই সীমাবদ্ধ নয়। পৃথিবীর ম্যান্টলই আসলে অনেক ভূ-পৃষ্ঠীয় ঘটনার ইঞ্জিন, যেমন- আগ্নেয়গিরি, মহাদেশ গঠন, বা পর্বত সৃষ্টি। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, ম্যান্টলের গভীর থেকে যে গরম পদার্থের স্তম্ভ ওপরে ওঠে, যাকে ম্যান্টল প্লুম বলা হয়, সেগুলোর উৎপত্তি সম্ভবত LLSVP–এর প্রান্তে। এই প্লুমগুলোই পরে পৃষ্ঠে এসে আগ্নেয়গিরির জন্ম দেয়, যেমন হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জে দেখা যায়। এই ধরনের গভীর গবেষণার জন্য বিজ্ঞানীরা ব্যবহার করেন বড় ভূমিকম্পের তথ্য। বিশেষ করে গভীর ভূমিকম্পগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উদাহরণ হিসেবে গবেষকরা উল্লেখ করেছেন ১৯৯৪ সালের বলিভিয়ার গভীর ভূমিকম্পকে। যা ঘটেছিল প্রায় ৬৫০ কিলোমিটার গভীরে। সৌভাগ্যবশত এতে পৃষ্ঠে বড় ক্ষয়ক্ষতি হয়নি, কিন্তু পৃথিবীর ভেতরের গঠন বোঝার জন্য এটি ছিল অমূল্য। ১৯৭৫ সাল থেকে সারা বিশ্বের সিসমোমিটারগুলো উচ্চমানের তথ্য সংগ্রহ করছে। ফলে পুরোনো ভূমিকম্পের তথ্যও নতুন প্রযুক্তি দিয়ে আবার বিশ্লেষণ করা সম্ভব হচ্ছে। সব মিলিয়ে এই গবেষণা পৃথিবীর অভ্যন্তর সম্পর্কে আমাদের ধারণা বদলে দিতে পারে। পৃথিবীর ম্যান্টল হয়তো একঘেয়ে, সমানভাবে মিশে থাকা অঞ্চল নয়। বরং সেখানে রয়েছে প্রাচীন, স্থির এবং বিশাল গঠন, যেগুলো কোটি কোটি বছর ধরে নীরবে টিকে আছে। এই অদৃশ্য মহাদেশগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয়, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় রহস্যগুলো অনেক সময় পায়ের নীচেই লুকিয়ে থাকে।
সূত্র: Earth . com ; March, 2026
