পৃথিবীর গুরুমণ্ডলে জলের হীরক-হদিশ

পৃথিবীর গুরুমণ্ডলে জলের হীরক-হদিশ

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২২ আগষ্ট, ২০২৬

পৃথিবীর পৃষ্ঠ থেকে হাজার হাজার কিলোমিটার গভীরে জল কীভাবে পৌঁছায় সেই সূত্র মিলেছে ব্রাজিলের জুয়িনা অঞ্চলের একটি হীরকখণ্ড থেকে। মাত্র ৩ মিলিমিটার আকারের এই হীরেটি সমুদ্রের অতি গভীর থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। বিজ্ঞানীরা হীরেটির ভেতরে আটকে থাকা একটি ক্ষুদ্র খনিজ-পকেট বিশ্লেষণ করেন। তা থেকে তাঁরা প্রথম প্রত্যক্ষ প্রমাণ পেয়েছেন যে গ্যোথাইট (Goethite) নামক একটি জলধারক খনিজ ভূ-অভ্যন্তরের গুরুমন্ডল/ ম্যান্টেল পর্যন্ত জল বহন করতে পারে। গত মে মাসে সায়েন্টিফিক রিপোর্টসে এই গবেষণার বিবরণ প্রকাশিত হয়।

গ্যোথাইট সাধারণত মাটি ও সমুদ্রতলের পরিবেশে তৈরি হয়। লোহা-সমৃদ্ধ খনিজের সঙ্গে জলের বিক্রিয়ায় গঠিত এই পদার্থটি তার কেলাস- কাঠামোর মধ্যে কিছু জলীয় অণু ধরে রাখতে পারে। বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল, সঞ্চলনশীল পাতের অধোগমনের সময় এই খনিজটি গভীরে নামার আগেই প্রায় ২০০° সেলসিয়াস তাপমাত্রায় ভেঙে গিয়ে জল ছেড়ে দেয়। ফলে ধারণা ছিল, গুরুমন্ডলের নিম্ন সীমা পর্যন্ত জল পৌঁছানো এর পক্ষে অসম্ভব।

কিন্তু জুয়িনার এই ‘সুপার-ডিপ’ হীরেটি সেই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেছে। এই ধরনের হীরে ভূপৃষ্ঠের প্রায় ৩০০ কিলোমিটারেরও বেশি নীচে গঠিত হয়। হীরের মধ্যে আটকে থাকা খনিজগুলো বাইরের পরিবর্তন থেকে সুরক্ষিত থাকে। ফলে সেগুলো পৃথিবীর গভীর অভ্যন্তরের প্রাচীন পরিবেশের প্রাকৃতিক প্রামাণ্য হিসেবে কাজ করে। ব্রাজিলের সিরিয়াস সিনক্রোট্রন কণাত্বরণযন্ত্রে একাধিক এক্স-রে প্রযুক্তি ব্যবহার করে গবেষকেরা হীরেটির অন্তর্ভুক্ত প্রায় ১০০টি খনিজ নিয়ে পরীক্ষা করেন। একটি সম্পূর্ণ সিল করা অংশে তাঁরা গ্যোথাইটের পাশাপাশি হেমাটাইট ও ম্যাগনেটাইটের উপস্থিতি শনাক্ত করেন। ত্রিমাত্রিক এক্স-রে টমোগ্রাফি থেকে নিশ্চিতভাবে জানা যায় যে, অংশটির সঙ্গে বাইরের কোনো ফাটলের যোগাযোগ ছিল না। ফলে বাতাসের সংস্পর্শে এসে পরে খনিজগুলো তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা কার্যত বাতিল হয়।

গবেষকদের মতে, অপেক্ষাকৃত ঠান্ডা সমুদ্রতলীয় পাতের গভীর ফাটলের মধ্যে গ্যোথাইট সুরক্ষিত অবস্থায় অধোগমনের মাধ্যমে অন্তত কয়েকশ কিলোমিটার গভীরে নেমে যেতে পারে। পরে উচ্চ তাপ ও চাপে এটি পরিবর্তিত হয়ে জল মুক্ত করতে পারে। সেই জল আশপাশের শিলার গলনাঙ্ক কমিয়ে সামান্য ম্যাগমা তৈরিতেও সাহায্য করতে পারে।

এই গবেষণাটি পৃথিবীর গভীরে জলচক্রের নতুন একটি সম্ভাব্য পথের সন্ধান দিয়েছে। এর আগে জুয়িনার একটি হীরেতে পাওয়া রিংউডাইট প্রমাণ করেছিল যে পৃথিবীর ট্রানজিশন জোনে/রূপান্তরিত অঞ্চলেও জল সঞ্চিত থাকতে পারে। নতুন এই আবিষ্কার দেখাল যে জল হয়তো আরও গভীরে, গুরুমন্ডলের সীমানা ছাড়িয়েও পৌঁছাতে পারে। এর থেকে পৃথিবীর অভ্যন্তর, আগ্নেয়গিরি ও দীর্ঘমেয়াদি জলচক্র সম্পর্কে প্রচলিত ধারণা আরও বিস্তৃত হতে পারে।

 

সূত্র: “Iron oxyhydroxide as water carrier to the Earth’s mantle” by Carolina Camarda, Fernanda Gervasoni,et.al; 11th May 2026, Scientific Reports.

DOI: 10.1038/s41598-026-46683-8

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

13 − one =