
বিদ্যুতের গতিতে একটি পেঙ্গুইন, হাজার হাজার কুচো চিঙড়ি গিলে ফেলে। সম্প্রতি এক গবেষণায় দেখা গেছে, জলে পেঙ্গুইনের মলের সামান্যতম অংশ মিশলেই, কুচো চিঙড়িরা পালানোর তাড়না অনুভব করে। গবেষণাটি ‘ফ্রন্টিয়ার্স ইন মেরিন সায়েন্স’ জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। “আমরা প্রথমবারের মতো দেখতে পেলাম, একটুখানি পেংগুইন মল দক্ষিণ মেরুর কুচো চিঙড়িদের খাদ্য গ্রহণ এবং সাঁতার কাটার আচরণে হঠাৎ পরিবর্তন ঘটায়,” বলেন মেইনের বিগেলো নিকোল ল্যাবরেটরিতে মহাসাগরীয় বিজ্ঞান বিষয়ক পোস্টডক্টরাল গবেষক হেলেসি। কুচো চিংড়িরা দক্ষিণ মহাসাগরে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এরা একটি প্রধান কার্বন সিঙ্ক হিসেবে কাজ করে এবং এরাই পেংগুইন, তিমি প্রভৃতি বিভিন্ন প্রজাতির প্রধান খাদ্য উৎস। কিছু পরিসংখ্যান অনুসারে, প্রায় ৭০০ ট্রিলিয়ন প্রাপ্তবয়স্ক দক্ষিণ মেরুর কুচো চিংড়ি এখনও এই ঠাণ্ডা জলে সাঁতার কাটছে। যদিও সম্ভবত জলবায়ুর পরিবর্তন, সমুদ্রের বরফ হ্রাস এবংক্রমশ অম্লধৰ্মী হয়ে ওঠা মহাসাগরের অবস্থার কারণে, তাদের জনসমষ্টি সময়ের সাথে সাথে আরও দক্ষিণে সরে গেছে। জুওপ্ল্যাংকটনের রাসায়নিক সংকেতের প্রতি এরা অত্যন্ত সংবেদি হয়। যা তাদের খাবার এবং সম্ভাব্য সঙ্গীর খোঁজে পরিচালনা করে। হেলেসি এবং তাঁর সহকর্মীরা জানতে চেয়েছিলেন যে এরা কি শিকারীদের গন্ধে প্রতিক্রিয়া দেখায়? তারা গবেষণাটি অ্যাডেলি পেঙ্গুইনের উপর করেন। এরা দক্ষিণ গোলার্ধের সবচেয়ে দক্ষিণে প্রজননকারী পেঙ্গুইন প্রজাতি। এই প্রজাতি খাবারের জন্য ৯৯.৬% ক্ষেত্রে অ্যান্টার্কটিক কুচো, চিঙড়ির উপর নির্ভর করে। একটি প্রাপ্তবয়স্ক অ্যাডেলি পেঙ্গুইন প্রতিদিন ১.৬ কিলোগ্রাম পর্যন্ত কুচো চিঙড়ি খেয়ে নিতে পারে। সারা বিশ্বের অ্যাডেলিরা প্রতি বছর প্রায় ১.৫ মিলিয়ন টন কুচো চিঙড়ি খায়। গবেষকরা ২০২২ সালের শেষের দিকে ব্র্যান্সফিল্ড প্রণালী তে, লরেন্স এম গুল্ড এবং নাথানিয়েল বি পলমার জাহাজে জ্যান্ত অ্যান্টার্কটিক কুচো চিঙড়ি সংগ্রহ করে পরে পালমার কেন্দ্রের মৎস্যাধারে রাখেন। এদিকে, পেঙ্গুইন গবেষকরা ওরই কাছে অ্যান্টার্কটিক উপদ্বীপের টরগারসেন দ্বীপের একটি ব স তি থেকে প্রায় ৭৮ গ্রাম অ্যাডেলির মল সংগ্রহ করেন। হেলেসি বলেন, “এটি থেকে পচা শেলফিশের মতো গন্ধ ছাড়ে। এ নিয়ে কাজ করা মোটেও সুখকর অনুভূতি নয়। পেঙ্গুইনের মলের প্রতি কুচো চিঙড়ির প্রতিক্রিয়া পরীক্ষার জন্য, বিজ্ঞানীরা একটি ফ্লুম ট্যাঙ্কে ১.৫°সে তাপমাত্রায়, পাঁচ মিনিটের জন্য ছয় থেকে আটটি কুচো চিঙড়ি ব্যবহার করে, আলো নিভিয়ে ৪০ মিটার গভীরতার শর্তগুলোকে অনুকরণ করে পরীক্ষা চালান। ফ্লুমের মধ্যে জল প্রতি সেকেন্ডে ৩ থেকে ৫.৯ সেন্টিমিটার গতিতে প্রবাহিত হচ্ছিল। এতে আলাদা আলাদা করে শৈবাল, পেঙ্গুইনের মল মেশানো হয়। প্রতিটি সেটআপ চারবার পরীক্ষা করা হয়। গবেষকরা প্রতিটি পরীক্ষার সময়, কুচো চিঙড়িদের গতিবিধি রেকর্ড করার জন্য দুটি স্বয়ংক্রিয় ক্যামেরা ব্যবহার করেন। এগুলি প্রতিটি প্রাণীর ত্রিমাত্রিক অবস্থান, গতি এবং সাঁতারের অভিমুখের সঠিক তথ্য দেয়। নিয়ন্ত্রিত সেটিংসে, কুচো চিঙড়ি সাধারণত স্রোতের বিপরীতে সোজা উপরে সাঁতার দেয়। কিন্তু অ্যাডেলির মলের উপস্থিতিতে, তাদের আচরণ হঠাৎ পরিবর্তিত হয়ে যায়। দেখা যায়, তারা তাদের সাঁতারের গতি, তাদের স্বাভাবিক গতির
তুলনায় ১.২ থেকে ১.৫ গুণ বাড়িয়ে দেয়। আগের তুলনায় গড়ে ১.৪ গুণ বড় কোণে তিন গুণ বেশি বাঁক নেয়। দ্বিতীয় পরীক্ষায় দেখা গেছে যে জলে গুয়ানো বা মল মেশানো থাকলে তারা শৈবাল খাওয়ার পরিমাণ ৬৪% কমিয়ে দেয়। ফলে, ঘণ্টায় প্রতিটি চিঙড়ির কার্বন উৎপাদন ১২. ৭ মাইক্রোগ্রাম কমে ৪.৬ মাইক্রোগ্রামে পৌঁছে যায়। এটিই প্রমাণ করে, সাঁতারের দিক পরিবর্তনের সাথে তাদের খাদ্য গ্রহনা কম হয়ে যায়।
গবেষকরা গতির এবং দিকের এই নাটকীয় পার্থক্যগুলোকে ব্যাখ্যা করেছেন। “নিকটবর্তী পেঙ্গুইনদের থেকে পালিয়ে যাওয়ার জন্য এমন আচরণ চিঙড়িদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা ব্যাপকভাবে বাড়িয়ে দেয়। ওরা যখন ঝাঁক বেঁধে থাকে, তখন বাকি প্রতিবেশী চিংড়িরা একই সংকেত শনাক্ত করতে পারে, একে অপরকে বিপদের কথা জানাতে পারে”, বলেছেন হেলেসি। তাদের এই আচরণগত পরিবর্তনটি আবিষ্কার করা গেলেও এখনও পরিষ্কার নয় যে পেঙ্গুইন মলের কোন নির্দিষ্ট পদার্থগুলি কুচো চিঙড়িদের মধ্যে এমন সতর্কতার আচরণ সৃষ্টি করে। “আমরা অনুমান করছি যে অ্যান্টার্কটিক কুচো চিংড়িরা পেঙ্গুইন মলে মিশ্রিত মৃত চিঙড়ি এবং মাছের গন্ধ পায়। তাই আমাদের অনুমান, ওরা অ্যান্টার্কটিকায় সীল, তিমি এবং অন্যান্য কুচো চিঙড়ি শিকারীদের চারপাশে একই ধরনের সাঁতার কাটার আচরণ দেখাবে এবং একইভাবে খাবার গ্রহণ কমিয়ে দেবে,” হেলেসি উল্লেখ করেছেন। “কৃষ্ণসীলের আচরণে কোনো পরিবর্তন ভবিষ্যতের দক্ষিণ মহাসাগরের উপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে, কারণ অ্যান্টার্কটিক কৃষ্ণসীল এই বাস্তুতন্ত্রের একটি মূল প্রজাতি।” জলবায়ু পরিবর্তন, দক্ষিণ মহাসাগরকে নতুন আকার দিচ্ছে। তাই কুচো চিঙড়িরা কীভাবে শিকারী সংকেতগুলি উপলব্ধি করে এবং প্রতিক্রিয়া জানায় তা বোঝার মাধ্যমে বৃহত্তর পারস্পরিক পরিবেশগত পরিবর্তনের পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব হতে পারে। যদি এরা তাদের চলাচল এবং খাদ্যগ্রহণে ব্যাপক পরিবর্তন আনে, তবে এটি সমগ্র সামুদ্রিক খাদ্যশৃঙ্খলা এবং কার্বন চক্র প্রক্রিয়াগুলিতে প্রভাব ফেলতে পারে। এটি মনে করিয়ে দেওয়া দরকার, সাধারণ রাসায়নিক সংকেতও মহাসাগরীয় বাস্তুতন্ত্রে বিশাল প্রভাব ফেলতে পারে।