প্রকৃতির মূল্য কত ? 

প্রকৃতির মূল্য কত ? 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ৫ জুন, ২০২৬

মানুষের প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহারের অদক্ষতা দিনে দিনে পৃথিবীকে গভীর সংকটের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। বন, নদী, সমুদ্র, বায়ুমণ্ডল ও জীববৈচিত্র্য—সবকিছুর ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ তৈরি হচ্ছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় কিছু অর্থনীতিবিদ মনে করেন, প্রকৃতির প্রতিটি উপাদানের আর্থিক মূল্য নির্ধারণ করা উচিত। তাদের যুক্তি হলো, যদি মানুষ প্রকৃতির মূল্য অর্থের হিসেবে বুঝতে পারে, তাহলে তারা সম্পদ কম অপচয় করবে এবং সংরক্ষণে বেশি আগ্রহী হবে। কিন্তু অনেক গবেষকের মতে, শুধুমাত্র অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বড় সংকটগুলোর সমাধান সম্ভব নয়।

রাষ্ট্রসঙ্ঘের একটি বিশেষজ্ঞ দল সম্প্রতি জিডিপি বা মোট দেশজ উৎপাদনের বাইরে জাতীয় উন্নয়ন মাপার জন্য নতুন কিছু সূচকের প্রস্তাব করেছে। Counting What Counts নামের প্রতিবেদনে ৩১টি সূচক তুলে ধরা হয়েছে, যেখানে মানুষের কল্যাণ, সামাজিক সমতা, পরিবেশগত স্থায়িত্ব ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে। এই উদ্যোগের ইতিবাচক দিক হলো, এটি স্বীকার করে যে উন্নয়ন শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে বোঝা যায় না; মানুষের জীবনমান ও প্রকৃতির সুস্থতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

তবে এ প্রতিবেদনের সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। এটি মূলত সমন্বিত সম্পদ হিসাব বা comprehensive wealth accounting পদ্ধতির ওপর নির্ভর করে। এই ধারণা অনুযায়ী বন, প্রাকৃতিক সম্পদ, মানব দক্ষতা কিংবা সামাজিক অবদানকে জাতীয় সম্পদের অংশ হিসেবে গণনা করা হয়। উদাহরণ হিসেবে একটি বনের কাঠের বাজারমূল্য নির্ধারণ করা তুলনামূলক সহজ। কিন্তু সেই বন যে বৃষ্টিপাত নিয়ন্ত্রণ করে, মাটি ক্ষয় রোধ করে বা বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন শোষণ করে—এসবের প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ অনেক কঠিন।

সমস্যা আরও জটিল হয়ে ওঠে যখন বিষয়টি বৈশ্বিক সম্পদের ক্ষেত্রে চলে আসে। বায়ুমণ্ডল, সমুদ্র বা জীববৈচিত্র্য কোনো একক দেশের মালিকানাধীন নয়। ফলে প্রশ্ন ওঠে—কে কতটা প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহার করার অধিকার রাখে? পৃথিবী সর্বোচ্চ কতটুকু পরিবেশগত চাপ সহ্য করতে পারে? এসব প্রশ্ন অর্থনীতির চেয়ে বেশি রাজনৈতিক ও নৈতিক।

অর্থনীতিবিদ হারম্যান ডেইলি ও জলবায়ু নীতিবিশেষজ্ঞ ফেলিক্স একার্ড সহ অনেক গবেষক মনে করেন, প্রকৃতির শুধু দাম নির্ধারণ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। কারণ বাজার সবসময় ন্যায্য বণ্টন নিশ্চিত করতে পারে না। আগে ঠিক করতে হবে পৃথিবীর সীমা কোথায় এবং সেই সীমার মধ্যে সম্পদের ব্যবহার কীভাবে ন্যায্যভাবে ভাগ করা হবে। তারপরই অর্থনৈতিক মূল্য নির্ধারণ অর্থবহ হতে পারে। তাই প্রকৃতি রক্ষার জন্য কেবল বাজারভিত্তিক সমাধান নয়, বরং বৈশ্বিক সহযোগিতা, ন্যায়বিচার ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তও সমানভাবে জরুরি।

 

 

সূত্র: nature.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

twelve + eleven =