দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অস্থির প্রেক্ষাপট। ইউরোপের আকাশে যুদ্ধের কালো মেঘের ঘনঘটা। ফ্যাসিবাদী রাজনীতির ছায়ায় ইহুদিদের জীবন ক্রমেই অতিষ্ট হয়ে উঠছে। সেই সময় ইতালির এক তরুণী বিজ্ঞানীর হাত ধরে সূচনা হল বিজ্ঞানের এক নতুন অধ্যায়ের। তিনি হলেন রিটা লেভি- মোন্তালচিনি(১৯০৯-২০১২)। তাঁর অধ্যবসায়, বুদ্ধিমত্তা এবং অদম্য কৌতূহল পরবর্তীকালে স্নায়ুবিজ্ঞানের গতিপথ বদলে দেয়। ইহুদি হওয়ার দোষে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কৃত হয়েও বিজ্ঞানের প্রতি নিষ্ঠা থেকে তিনি একচুলও সরে যাননি।
১৯৩৬ সালে তিনি ইতালির টিউরিন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। শুরুতে চিকিৎসাবিদ্যা নিয়ে পড়াশোনা করলেও, এক প্রভাবশালী শিক্ষকের প্রেরণায় স্নায়ুতন্ত্রের বিকাশ ও গঠন নিয়ে গবেষণায় আগ্রহী হয়ে ওঠেন। কিন্তু ১৯৩৮ সালে স্বৈরশাসক বেনিতো মুসোলিনির জারি করা জাতিবিদ্বেষী আইনের প্রকোপে ইতালিতে সব ইহুদিদের বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকারি পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়। এই সিদ্ধান্ত রিটার বিদ্যায়তনিক ভবিষ্যৎ প্রায় ছিন্নভিন্ন করে দেয়।
কিন্তু তিনি হাল ছাড়েননি। বিশ্ববিদ্যালয়ের দরজা বন্ধ হয়ে গেলেও তাঁর কৌতূহলের দরজা বন্ধ হয়নি। নিজের শোবার ঘরেই তিনি গড়ে তোলেন একটি ছোট্ট, চলনসই অস্থায়ী গবেষণাগার। সেখানে ছিল কেবল কিছু সাধারণ যন্ত্র, একটি মাইক্রোস্কোপ, আর ছিল অসীম নিষ্ঠা। সেখানেই তিনি মুরগির ভ্রূণের ওপর পরীক্ষা চালান এবং স্নায়ুকোষের বিকাশ ও মৃত্যুর প্রক্রিয়া নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ করেন। এইসব পরীক্ষাই তাঁকে এক যুগান্তকারী আবিষ্কারের দিকে নিয়ে যায়। স্নায়ুকোষের নিয়ন্ত্রিত মৃত্যু সম্পর্কে তাঁর নতুন ধারণা জন্মায়। তিনি অনেক পরে ১৯৯৬ সালে BBC-কে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, এই পরীক্ষাটিই তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
যুদ্ধকালীন ইতালিতে তাঁর গবেষণাপত্র প্রকাশের সুযোগ ছিল না। তিনি বহু চেষ্টা করে বিদেশি জার্নালে তাঁর গবেষণাপত্র পাঠান। তাঁর কাজ নজরে আসে মার্কিন বিজ্ঞানী ভিক্টর হ্যামবার্গারের, যিনি তখন যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট লুইস-এ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত। তাঁর আমন্ত্রণে রিটা যুক্তরাষ্ট্রে চলে আসেন। সেখানে বিস্তৃততর গবেষণার সুযোগ পান। এই সময়েই তিনি আবিষ্কার করেন যে স্নায়ুকোষের বৃদ্ধি ও টিকে থাকার জন্য একটি বিশেষ প্রোটিন অপরিহার্য। এটিই পরে স্নায়ু-বিকাশ উপাদান বা “নার্ভ গ্রোথ ফ্যাক্টর” (এন জি এফ) নামে পরিচিত হয় এবং আধুনিক স্নায়ুবিজ্ঞানের এক মৌলিক ভিত্তি হয়ে ওঠে।
এই অসামান্য আবিষ্কারের স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৮৬ সালে তিনি যৌথভাবে শারীরবিদ্যা বা চিকিৎসাশাস্ত্রে নোবেল পুরস্কার পান। শতবর্ষের কাছাকাছি বয়সেও তিনি যথেষ্ট সক্রিয় ও চিন্তাশীল ছিলেন। ২০০৮ সালে নোবেল পুরস্কার সংস্থায় তিনি বলেন, তিনি নিজেকে যত না বিজ্ঞানী, তার চেয়ে শিল্পী হিসেবেই বেশি ভাবেন। তাঁর মতে, তাঁর আসল শক্তি ছিল প্রবল অন্তর্দৃষ্টি ও সৃজনশীল মনন। রিটা লেভি-মোন্তালচিনির গবেষণা আমাদের স্নায়ুতন্ত্রের বিকাশ, ক্ষয় ও পুনর্গঠন সম্পর্কে গভীর জ্ঞান দিয়েছে। বিশেষ করে স্মৃতিক্ষয় ও অন্যান্য স্নায়ু-অবক্ষয়জনিত রোগ নিয়ে গবেষণায় তাঁর আবিষ্কার আজও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
একটি ছোট্ট শোবার ঘর থেকে শুরু করে নোবেল পুরস্কারের মঞ্চ। রিটার জীবন প্রমাণ করে, জ্ঞানচর্চার শক্তি রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা বা সামাজিক বৈষম্যের কাছে পরাজিত হয় না। প্রকৃত অর্থেই তাঁর জীবন প্রতিকূলতার মুখে দৃঢ়তা, সাহস এবং জ্ঞানের প্রতি অবিচল অধ্যবসায়ের এক অনন্য উদাহরণ।
সূত্র: The discovery of nerve growth factor, BBC Witness History.
