প্রয়াত এম পি পরমেশ্বরন

প্রয়াত এম পি পরমেশ্বরন

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২১ আগষ্ট, ২০২৬

পরমাণু বিজ্ঞানের গবেষণাগার থেকে গ্রাম, স্কুল, নদী, বন আর মানুষের আন্দোলন। এম পি পরমেশ্বরনের জীবনের পথটি ছিল এক অনন্য বৌদ্ধিক যাত্রা। ১১ আগস্ট কেরলের ত্রিশূরে নিজের বাড়িতে ৯১ বছর বয়সে প্রয়াত হয়েছেন এই পরমাণু বিজ্ঞানী, বিজ্ঞানলেখক ও পরিবেশকর্মী। বয়সজনিত নানা সমস্যায় ভুগছিলেন তিনি। ১৯৩৫ সালের ১৮ জানুয়ারি ত্রিশূরের কিরালুরে জন্ম পরমেশ্বরনের। ১৯৫৬ সালে তিরুবনন্তপুরমের কলেজ অফ ইঞ্জিনিয়ারিং থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে সোভিয়েত ইউনিয়নে যান। মস্কো পাওয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউট থেকে পরমাণু প্রকৌশলে ডক্টরেট করে, যোগ দেন ভাবা অ্যাটমিক রিসার্চ সেন্টারে। ভারতের পরমাণু কর্মসূচির ভিত গড়ার সেই সময়ের বৈজ্ঞানিক পরিকাঠামোর অংশ ছিলেন তিনি। কিন্তু গবেষণাগারই তাঁর একমাত্র ঠিকানা হয়ে থাকেনি। ১৯৭৫ সালে ভাবা ছেড়ে তিনি যুক্ত হন কেরল শাস্ত্র সাহিত্য পরিষদের সঙ্গে। বিজ্ঞানচর্চাকে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার যে আন্দোলনটি তখন ধীরে ধীরে গণআন্দোলনের রূপ নিচ্ছিল, পরমেশ্বরন তারই অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুখ হয়ে ওঠেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, বিজ্ঞান কেবল গবেষণাগার, বিশ্ববিদ্যালয় বা সরকারের সম্পত্তি হতে পারে না। মানুষের নিজের ভাষায়, নিজের জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত করে বিজ্ঞানকে বোঝার সুযোগ দিতে হবে। তাই মালয়ালমে তিনি লিখেছেন পরমাণু বিজ্ঞান, গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান থেকে পরিবেশ, অর্থনীতি ও সমাজবিজ্ঞান নিয়ে। শিশু, শ্রমিক, শিক্ষক এবং নবীন সাক্ষরতার প্রজন্ম-সবাইকে পাঠক-ই ভেবেছেন তিনি।

এই কাজের মধ্য দিয়েই তৈরি হয়েছিল তাঁর সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ও সামাজিক ধারণা- জ্ঞান মানুষের ক্ষমতা বাড়াবে, কর্তৃত্বের সামনে প্রশ্ন করার সাহস দেবে। এই ভাবনার সবচেয়ে স্মরণীয় প্রকাশগুলির একটি ছিল সাইলেন্ট ভ্যালি রক্ষার আন্দোলন। পালাক্কাড়ের ঘন চিরহরিৎ অরণ্যে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের প্রস্তাবকে উন্নয়নের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হলেও পরমেশ্বরন, পরিবেশকর্মী এম কে প্রসাদ এবং অন্যরা প্রশ্ন তুলেছিলেন, বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য এমন একটি অনন্য প্রতিবেশ ব্যবস্থা ধ্বংস করা কি সত্যিই যুক্তিসঙ্গত? বিজ্ঞানী, শিক্ষক, লেখক, ছাত্র এবং সাধারণ মানুষকে সঙ্গে নিয়ে গড়ে ওঠা সেই আন্দোলন শেষ পর্যন্ত প্রকল্প বাতিলের পথ তৈরি করে। কিন্তু পরমেশ্বরনের অবদান শুধু একটি বন বাঁচানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি কেরলকে আরও বড় একটি প্রশ্ন করতে শিখিয়েছিলেন: “উন্নয়ন কার জন্য?” পরবর্তী সময়ে আথিরাপ্পিল্লি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প, ওয়ানাড়ের পরিবেশ রক্ষা এবং কুডানকুলম পরমাণু প্রকল্প বিরোধী আন্দোলনেও তাঁর অবস্থান স্পষ্ট ছিল। পরমাণু শক্তির সমালোচনা তাঁর ক্ষেত্রে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ তিনি বাইরে থেকে পরমাণু প্রযুক্তির বিরোধিতা করেননি। নিজেই ছিলেন এই প্রযুক্তির প্রশিক্ষিত বিজ্ঞানী। নিরাপত্তা, বিপুল ব্যয়, বিপর্যয়ের ঝুঁকি এবং প্রকল্পের সামাজিক মূল্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন তিনি। তাঁর কাছে পরিবেশবাদ শুধু গাছ বা বন রক্ষার বিষয় ছিল না। পরিবেশ জড়িয়ে ছিল অর্থনীতি, প্রযুক্তি, রাজনীতি এবং সামাজিক ন্যায়ের সঙ্গে। কে প্রযুক্তির সুবিধা পাবে, আর তার মূল্য কে দেবে- এই প্রশ্নও তাঁর কাছে সমান গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ত্রিশূরের পরিবেশকর্মী ও ‘ট্রি ওয়াক’-এর সমন্বয়কারী অনিতা শান্তির স্মৃতিতে পরমেশ্বরন ছিলেন “নম্রতার প্রতিমূর্তি”, কিন্তু নিজের বিশ্বাসে অত্যন্ত দৃঢ়। পরিবেশকর্মী এস উষার কথায়, সাধারণ মানুষের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিল অসাধারণ-“ সাধারণ মানুষই তাঁর লড়াইগুলির মদতদাতা হয়ে উঠেছিল।” পরমেশ্বরনের কাজ ছড়িয়ে ছিল সাক্ষরতা অভিযান, বিজ্ঞানশিক্ষা, উপযুক্ত প্রযুক্তি, বিকেন্দ্রীভূত উন্নয়ন এবং জনবিজ্ঞান আন্দোলনেও। তাঁর কাছে সাক্ষরতা মানে শুধু পড়তে-লিখতে শেখা নয়; নিজের চারপাশের পৃথিবীকে বোঝা এবং তাকে বদলানোর আত্মবিশ্বাস অর্জন করা। জীবনের শেষদিকে শরীর দুর্বল হয়ে পড়েছিল, চলাফেরার জন্য হুইলচেয়ারের সাহায্য নিতে হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন করার অভ্যাস থামেনি। তিনি বারবার তরুণদের, সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছতে এবং তাঁদের স্বপ্ন দেখতে বলতেন। তাঁর জীবন যেন শেষ পর্যন্ত একটি কথাতেই এসে মেলে- পরমেশ্বরন মানুষকে উন্নয়নের বিরোধিতা করতে শেখাননি, শিখিয়েছেন উন্নয়ন বলতে আমরা কী বুঝি, সেই প্রশ্ন করতে। বিজ্ঞানকে অবিশ্বাস করতে শেখাননি, শিখিয়েছেন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সিদ্ধান্তের কাছে সমাজেরও প্রশ্ন করার অধিকার আছে। সেই প্রশ্ন করার সাহসই সম্ভবত তাঁর সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার।

 

সূত্র: Down to Earth; Aug; 2026

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

2 × 5 =