প্রশান্ত মহাসাগরের সোনালী প্রবাল বৃক্ষ 

প্রশান্ত মহাসাগরের সোনালী প্রবাল বৃক্ষ 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২৮ আগষ্ট, ২০২৬

প্রশান্ত মহাসাগরের গভীরে, কোস্টারিকার উপকূলের সমুদ্রতল থেকে বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেছেন উজ্জ্বল হলুদ বর্ণের প্রবাল। দূর থেকে দেখলে মনে হয় শাখা – প্রশাখাধারী সোনালী বৃক্ষ।প্রায় ৩৬০ থেকে ৫২৯ মিটার গভীরে সমুদ্রের তলদেশের পাথুরে সিমাউন্ট বা ডুবো পাহাড়ের ওপর এই প্রবাল বসতির সন্ধান মিলেছে। কোথাও কোথাও এগুলির উচ্চতা এক মিটার ছাড়িয়ে গেছে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয়, এই প্রবালগুলি এমন পাথুরে অঞ্চলে প্রচুর পরিমাণে জন্মেছে, যেগুলি প্রায় সম্পূর্ণভাবে ঢাকা ছিল এক ভঙ্গুর নক্ষত্রাকার সামুদ্রিক প্রাণী দিয়ে, যার নাম ব্রিটল স্টার।

২০১৯ ও ২০২৩ সালের দুটি সমুদ্র অভিযানে দূরনিয়ন্ত্রিত ডুবযান SuBastian ব্যবহার করে গবেষকরা প্রবালটির নমুনা সংগ্রহ করেন। অভিযানগুলি কোস্টারিকার প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে এবং Isla del Coco-র কাছাকাছি সিমাউন্টগুলিতে চালিত হয়েছিল। প্রথম দেখাতেই প্রবালটির সৌন্দর্য গবেষকদের মুগ্ধ করেছিল। কিন্তু পরবর্তী শারীরিক গঠন বিশ্লেষণে বোঝা যায়, এটি পরিচিত কোনো প্রবালগোষ্ঠীর সঙ্গে সহজে মেলে না।

প্রবালটির নতুন গণের নাম দেওয়া হয়েছে Laurinque, যা লেখক J.R.R. Tolkien-এর তৈরি এলভিশ ভাষা Quenya-র “Laurinquë” শব্দ থেকে নেওয়া—অর্থ ‘সোনালি গাছ’। এর প্রজাতির নাম elenya, যার অর্থ ‘নক্ষত্রময়’ বা ‘নক্ষত্র সম্পর্কিত’। আশপাশে অসংখ্য ব্রিটল স্টারের উপস্থিতির কারণেই এই নামকরণ। অর্থাৎ নামের মধ্যেই প্রবালটির সোনালি রং, গাছের মতো আকৃতি এবং নক্ষত্রের মতো দেখতে প্রতিবেশী প্রাণীদের উপস্থিতি—তিনটিই ফুটে উঠেছে।

প্রবালটির শ্রেণিবিন্যাস নির্ধারণ করাই ছিল গবেষকদের কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তিনটি প্রচলিত জিন ব্যবহার করে এর বংশগত সম্পর্ক পরীক্ষা করা হয়। তাতে প্রতিটি জিন এটিকে আলাদা আলাদা পরিবারের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে দেখায়। এই বিরল জিনগত অসঙ্গতি মেটাতে বিজ্ঞানীরা শত শত জিন একসঙ্গে বিশ্লেষণ করে ফাইলোজেনোমিক পদ্ধতি ব্যবহার করেন। তাতে স্পষ্ট হয়, প্রবালটি আগে পরিচিত কোনো পরিবারের অন্তর্ভুক্ত নয়। ফলে এর জন্য নতুন পরিবার Laurinqueidae এবং নতুন গণ Laurinque প্রতিষ্ঠা করতে হয়েছে।

এই আবিষ্কারের মাধ্যমে জানা গেল, কোস্টারিকার ডুবো পাহাড় এবং গভীর সমুদ্রের জীববৈচিত্র্য এখনও অনেকটাই অজানা। গবেষকদের মতে, গভীর সমুদ্র পৃথিবীর প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ জুড়ে বিস্তৃত, অথচ এর বিশাল অংশ এখনও অনুসন্ধানের বাইরে। এমন প্রবাল উদ্যান গভীর সমুদ্রের বহু প্রাণীর আশ্রয়স্থল হওয়ায় এগুলি গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদী সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র। কোস্টারিকার গভীর সমুদ্রের এই সোনালি বৃক্ষরূপী প্রবাল বিজ্ঞানীদের কাছে একই সঙ্গে বিবর্তনের রহস্য, জীববৈচিত্র্যের নতুন অধ্যায় এবং সমুদ্রের অদেখা জগতের এক ঝলকও বটে।

 

সূত্র: “A coral among stars: A new octocoral family (Anthozoa, Octocorallia, Malacalcyonacea) from seamounts in the tropical eastern Pacific” by Odalisca Breedy, Catherine S. McFadden, Catalina Murillo-Cruz, Ana-Belén Yánez-Suárez, Katleen Robert and Andrea M. Quattrini, 30 June 2026, ZooKeys.DOI: 10.3897/zookeys.1283.191899

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

13 + 15 =