প্রাচীন কেরালার জগদ্বিখ্যাত গণিত ঘরানা-2 

প্রাচীন কেরালার জগদ্বিখ্যাত গণিত ঘরানা-2 

জর্জ গেভার্গিজ জোসেফ
Posted on ১০ এপ্রিল, ২০২৬

নীলকণ্ঠ

পরমেশ্বরের স্থাপিত ভিত্তির ওপরেই কেরালা ঘরানার নীলকণ্ঠ সোমাইয়ার মতো প্রধান চরিত্রর উদ্ভব। ১৪৪৪ সালে ত্রিক্কান্তিয়ুর নামক স্থানের এক নাম্বুথিরি সোমাত্রি ব্রাহ্মণ পরিবারে তাঁর জন্ম। জায়গাটি আজকের দিনের মল্লপুরম জেলার পোন্নানি তালুকের অন্তর্গত। তাঁদের পারিবারিক গৃহ বর্তমানের এটামার ভবনে ছিল বলে জানা গেছে।

জ্যোতির্বিজ্ঞানে অগাধ জ্ঞানের জন্য নীলকণ্ঠ তাঁর পৃষ্ঠপোষক ও ধর্মগুরু কৌশিতকী নেত্রনারায়ণ আঝভানচেরি তাম্প্রক্কাল-এর কাছে খুবই সম্মানিত ছিলেন। তিনি আর্যাকে বিবাহ করেন। তাঁদের দুটি পুত্রসন্তান হয়েছিল, নাম রামা আর দক্ষিণমূর্তি। দুজনেই সংস্কৃত, মলয়ালম আর তামিল এই তিনটি ভাষায় ‘মনুস্মৃতি’ এবং অন্যান্য ধর্মশাস্ত্রে সুপণ্ডিত ও সড়গড় ছিলেন। রামা ছিলেন ‘শ্রীরামায়ণম’ (‘লঘুরামায়ণম’)-এর রচয়িতা। ‘সিদ্ধান্তদর্পণ’-এ নীলকণ্ঠ তাঁর শিক্ষকদের নাম দিয়েছেন। রবির কাছে শিখেছিলেন বেদান্ত শাস্ত্র, দামোদর আর তাঁর ‘পরমগুরু’ পরমেশ্বরের কাছে শিখেছিলেন জ্যোতির্বিজ্ঞান আর গণিত।

নীলকণ্ঠ জ্যোতির্বিজ্ঞানের ওপর বেশ কয়েকটি প্রভাবশালী গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। যেমন ‘গোলসার’ নামক একটি সংক্ষিপ্ত জ্যোতির্বিজ্ঞান প্রবেশিকা। এর আলোচ্য বিষয় ছিল জ্যোতির্বিজ্ঞানের মূল ধ্রুবক ও ধ্যানধারণাদি, গ্রহদের অবস্থান ও চলন, সাইন গণনা প্রভৃতি। সাইন গণনার জন্য তাঁর কাজ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি ভাষ্য এবং ভাষ্যের ওপর ভাষ্য রচনা করেছিলেন, যেমন ‘সিদ্ধান্তদর্পণ’ ও তার ওপর ব্যাপক ভাষ্য। আর্যভটর ‘আর্যভটীয়’র ওপর ভাষ্য, ‘চন্দ্রচ্ছায়াগণিত’ এবং তার ওপর একটি ভাষ্য, যাতে ক্রমচ্ছায়া ও বিপরীতচ্ছায়া সংক্রান্ত গণনা করেছিলেন। ক্রমচ্ছায়া হল সময়ের নিরিখে ছায়ার গণনা, বিপরীতচ্ছায়া ছায়ার নিরিখে সময় গণনা।‘তন্ত্রসংগ্রহ’ তাঁর প্রধান গ্রন্থ। এতে তিনি বেশ কিছু অভিনব জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক ও গাণিতিক ধ্যানধারণার প্রবর্তন করেছিলেন। ‘গ্রহণনির্ণয়’ গ্রন্থে সূর্যের ও চন্দ্রের গ্রহণ সংক্রান্ত গণনা নিয়ে লিখেছিলেন।

নীলকণ্ঠের জনপ্রিয়তা আর কেরালার বাইরের জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগের সাক্ষ্য মেলে তাঁর ‘সুন্দররাজ-প্রশ্নোত্তর’বইতে। এটি জ্যোতির্বিজ্ঞানের এক ব্যবহার-নির্দেশিকা। সমকালের এক তামিল জ্যোতির্বিজ্ঞানী তাঁর কাছে কতকগুলি প্রশ্ন উথাপন করেছিলেন, তাদেরই বিস্তারিত উত্তর তিনি ওই বইতে দেন। সুন্দররাজ যে তাঁকে সসম্ভ্রমে ‘ষড়রষণী পরমগাতা’ (ষড়দর্শনজ্ঞ) বলে সম্বোধন করেছিলেন তা থেকেই তাঁর খ্যাতির প্রমাণ মেলে। এই খ্যাতির মূলে ছিল তাঁর রচিত ‘তন্ত্রসংগ্রহ’। এ বইতে আটটি অধ্যায় জুড়ে ৪৩২টি শ্লোকের মধ্য দিয়ে তিনি জ্যোতির্বিজ্ঞানের গণনা সংক্রান্ত নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছিলেন। এ কাজে তিনি পরমেশ্বর প্রবর্তিত দৃগ্‌-গণিত রীতি অনুসরণ করেছিলেন। সূর্যঘড়ির প্রক্ষেপদণ্ড কী করে লাগাতে হয়, দ্রাঘিমা ও অক্ষাংশ গণনা, আনতি গণনা, গ্রহণের পূর্বাভাস দান প্রভৃতি বিষয় তার অন্তর্গত ছিল। এর ব্যাপ্তি আর মৌলিকত্ব কতখানি তার নিদর্শন স্বরূপ নীলকণ্ঠর যে-দুটি অভিনব অবদান জ্যোতির্বিজ্ঞানের ইতিহাসে স্মরণীয় তাদের কথা ভাবা যাক।

‘তন্ত্রসংগ্রহ’-য় নীলকণ্ঠ পৃথিবীর কাছের দুই গ্রহ বুধ ও শুক্রর আর্যভট-প্রস্তাবিত মডেলটির একটি বড়ো রকমের পরিমার্জন ঘটিয়েছিলেন। এই করতে গিয়ে তিনি ওই দুটি গ্রহর কেন্দ্রের সমীকরণকে সুনির্দিষ্টভাবে এবং নির্ভুলভাবে চিহ্নিত করতে পেরেছিলেন। কেপলারের আগে ইসলামি কিংবা ইউরোপীয় কোনো জ্যোতির্বিজ্ঞানীই তা এত নিখুঁতভাবে চিহ্নিত করতে পারেননি। মনে রাখতে হবে, কেপলারের জন্ম নীলকণ্ঠর প্রায় ১৩০ বছর পর। ‘আর্যভটীয়ভাষ্য’-য় নীলকণ্ঠ গ্রহগতি গণনার এক ছক তৈরি করেন, যা পরবর্তীকালে টাইকো ব্রাহে প্রণীত পদ্ধতির তুলনায় উন্নত। কারণ নীলকণ্ঠর পদ্ধতিতে পৃথিবীর কাছের দুই গ্রহর কেন্দ্র আর অক্ষীয় গতির সমীকরণটিকে হিসেবের মধ্যে আনা হয়েছিল। এই গণনা-পদ্ধতির মূলে নিহিত ছিল গ্রহগতির এক সূর্য-কেন্দ্রিক মডেল। সে-মডেলে বুধ, শুক্র, মঙ্গল, বৃহস্পতি আর শনি গ্রহ মধ্যবর্তী সূর্যকে ঘিরে উৎকেন্দ্রিক কক্ষপথে পাক খায় আর সূর্য পাক খায় পৃথিবীকে ঘিরে। কোপারনিকাসের সূর্যকেন্দ্রিক মডেলের পরিমার্জন করতে গিয়ে ব্রাহেও এই রকম মডেলের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তাৎপর্যের বিষয় হল, কেরালা ঘরানায় জ্যেষ্ঠদেব, অচ্যুত পিসারোথি, পুটুমান সোমাইয়াজি সমেত নীলকণ্ঠের অনুসারী প্রত্যেক জ্যোতির্বিজ্ঞানীই নীলকণ্ঠের এই গ্রহ-মডেল মেনে নিয়েছিলেন।

জীবনের পরবর্তী অধ্যায়ে তিনি যেসব রচনা করেন সেগুলি তাঁর পুরোনো রচনার ভাষ্য, ব্যতিক্রম ‘গোলসার’ নামক রচনা। ‘গোলসার’ তিন অধ্যায়ে বিভক্ত গোলীয় জ্যোতির্বিজ্ঞানের একটি পাঠ্যবই। তাঁর পুরোনো রচনার ভাষ্যগুলির মধ্যে ‘চন্দ্রবাক্যগণিত’আর ‘সিদ্ধান্তদর্পণ’ উল্লেখযোগ্য। শেষেরটি তাঁর ‘বাক্যকরণ’-এর অন্তর্ভুক্ত একটি ছোটো রচনা। এতে ‘বাক্যকরণ’ সম্পর্কে সুন্দররাজের ভাষ্য বিষয়ে নীলকণ্ঠর সপ্রশংস মন্তব্য আছে, যা নীলকণ্ঠ সম্বন্ধে সুন্দররাজের মন্তব্যের সঙ্গেই তুলনীয়। এই সংলাপটা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি কেরালার বাইরে দক্ষিণ ভারতের অন্যান্য জায়গায় কেরালার গণিত চর্চা সম্বন্ধে আগ্রহের এক দুর্লভ প্রমাণ। এখানে ৩২টি শ্লোকে জ্যোতির্বিজ্ঞানের প্রধান প্রধান ধ্রুবক সম্বন্ধে, উপবৃত্তিকা তত্ত্ব সম্বন্ধে এবং প্রাসঙ্গিক অন্য অনেক বিষয় সম্বন্ধে আলোচনা করা হয়েছে।

নীলকণ্ঠ সম্ভবত শতাধিক বছর বেঁচেছিলেন। দীর্ঘ জীবনকালে তিনি বহু ছাত্রকে শিক্ষা দিয়েছিলেন, তাঁদের অনেকেই নিজগুণে বিশিষ্ট চরিত্র হয়ে উঠেছিলেন। তাঁর ‘তত্ত্বসংগ্রহ’ ছিল তখনো পর্যন্ত জানা যাবতীয় ফলের সমাহার। এ বইয়ের ভিত্তিতে তাঁর উত্তরসূরিগণ বেশ কয়েকটি ভাষ্য রচনা করেহিলেন, সংস্কৃতে ও মলয়ালামে, যেগুলি কেরালার গণিত ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের মূল্যায়নের বনেদ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ।

তাঁর এক ছাত্র চিত্রভানু ( ১৫৫০) ছিলেন কোভ্‌ভারম গ্রামের (বর্তমান ত্রিসুর-এর কাছে) এক নাম্বুথিরি ব্রাহ্মণ। ১৫৩০ সালে তিনি রচনা করেন ‘করণাম্রত’। দৃগ গণিত প্রণালীর কাঠামো অনুসরণ করে এতে চারটি অধ্যায়ে জ্যোতির্বিজ্ঞানের অগ্রসর গণনা পেশ করা হয়েছিল। এই রচনাটির ভিত্তিতেই কেরালার ‘পঞ্চগম’ ক্যালেন্ডারের প্রস্তুতিপর্বর সূত্রপাত। এ ছাড়া তিনি রচনা করেছিলেন একুশটি প্রশ্নোত্তর সংবলিত ‘একবিংশতিপ্রশ্নোত্তর’।

 

শঙ্কর

নীলকণ্ঠ, চিত্রভানু আর দামোদর এই তিনজনেরই শিষ্য হওয়ার সুবাদে শঙ্করের জ্যোতির্বিজ্ঞান ঘরানাকে সরাসরি মাধব পর্যন্ত টেনে নিয়ে যাওয়া যায়। নাম্বুথিরিদের ধর্মগুরু নারায়ণ আঝভানসেরি তামপ্রক্কাল জ্যোতির্বিজ্ঞান আর গণিতের প্রসারে খুব উৎসাহী ছিলেন। তিনি ছিলেন শঙ্করের এক পৃষ্ঠপোষক। এই গুরুর অনুরোধে শঙ্কর ১৫৫৬ সালে রচনা করেন নীলকণ্ঠর ‘তন্ত্রসংগ্রহ’-র এক সংক্ষিপ্ত ভাষ্য যার নাম ‘লঘুবিবৃতি’। এটিই তাঁর শেষ রচনা। এর আগে শঙ্কর ‘যুক্তিদীপিকা’ এবং ‘ক্রিয়াকল্প’ নামে দুটি ভাষ্য লিখেছিলেন। তবে পিছনের দিকে তাকিয়ে আজ মনে হয়, দ্বিতীয় ভাস্করের ‘লীলাবতী’-ভাষ্য ‘ক্রিয়াক্রমকারী’-ই তাঁর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রচনা। ‘লীলাবতী’-র ১৯৯তম শ্লোকের পর এটি অসম্পূর্ণ রয়ে গিয়েছিল। তারপর কেরালার এক সুপরিচিত সাহিত্যতাত্ত্বিক মহিষমঙ্গলম-এর পীড়াপীড়িতে তাঁর পুত্র মহিষমঙ্গলম নারায়ণ এটি সম্পূর্ণ করার ভার নেন। এই ভাষ্যটি কেরালার গণিত ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের ইতিহাসে বিশিষ্ট স্থানের অধিকারী। কেননা গোবিন্দস্বামিন, শ্রীধর, জয়দেব প্রমুখ আগেকার লেখকদের রচনা আর পাওয়া যায় না। শুধু তাই নয়, আগেকার বেশ কিছু ফলের যুক্তিযুক্ততা ও প্রমাণও এখানে উপস্থিত করা হয়েছে। শঙ্করের নামে প্রচলিত আরও দুটি রচনা হল চার অধ্যায়ে বিভক্ত জ্যোতির্বিজ্ঞান বিষয়ক ‘করণসার’ (১৫৫০) এবং মলয়ালমে লেখা তারই সবিস্তার ভাষ্য ‘করণসার-ক্রিয়াক্রম’। (চলবে)

অনুবাদ : আশীষ লাহিড়ী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

nineteen + 10 =