জ্যেষ্ঠদেব
নীলকণ্ঠ আর দামোদরের আরেক ছাত্র ছিলেন শঙ্করের সমসাময়িক জ্যেষ্ঠদেব (১৫০০-১৬১০) নামক এক নাম্বুথিরি ব্রাহ্মণ। এঁর রচিত ‘যুক্তিভাষ’ গ্রন্থটি কেরালা ঘরানায় ক্রান্তিক গুরুত্বের অধিকারী। ইনি আলাথিউর গ্রামের পারাওট্টু পরিবারের সন্তান। ওই গ্রামটিই কেরালা ঘরানার পূর্বোল্লেখিত কয়েকজন সদস্যের জন্মস্থান। আলাথিউর-এ পারাওট্টু পরিবারের বাড়িটি আজও বিদ্যমান।
‘যুক্তিভাষ’ দুটি ভাগে বিভক্ত। মলয়ালমে লিখিত প্রথম ভাগটিতে অতীব গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি গাণিতিক ফলের যুক্তিযুক্ততা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এছাড়া মাধব-এর কয়েকটি ফলও আলোচিত হয়েছে , যথা π এবং সাইন-এর অসীম সিরিজ, সাইন রাশির মান গণনা, বিবিধ সিরিজের আসন্নায়ন এবং তাদের যুক্তিযুক্ততা। যুক্তিভাষ-এর দ্বিতীয় ভাগটির বিষয় হল জ্যোতির্বিজ্ঞান।
কেরালা ঘরানা নিয়ে পাশ্চাত্যের সি এম হুইশ-ই প্রথম কাজ করেন। তাঁর মতে জ্যেষ্ঠদেব মলয়ালমে ‘দৃককরণ’ নামে আরেকখানা বই লিখেছিলেন ১৬০৮ সালে। ‘যুক্তিভাষ’-এর অন্তত তিনটি ভাষ্য পাওয়া যায়। তার মধ্যে মলয়ালম ভাষ্যটি গোটা কেরালা জুড়ে জ্ঞান সঞ্চারের এক গুরুত্বপূর্ণ উৎস হয়ে ওঠে। নীলকণ্ঠের ‘তন্ত্রসংগ্রহ’-র ভিত্তিতে রচিত এই গ্রন্থটি এই অর্থে অনন্য যে সেকালের জ্যোতর্বিজ্ঞানী/গণিতবিদদের ব্যবহৃত বহু উপপাদ্য আর সূত্রর বিস্তারিত যুক্তি প্রতিপাদন, প্রমাণ, কিংবা ডেরিভেশন এতে পাওয়া যায়।
অচ্যুত পিসারোথি
জ্যেষ্ঠদেবের শিষ্য অচ্যুত পিসারোথি (১৫৫০-১৬২১) তাঁর রচিত ‘উপরাগক্রিয়াকর্ম’গ্রন্থে গুরু সম্বন্ধে সসম্ভ্রমে উল্লেখ করেন। তাঁর লেখা থেকে ইংগিত পাওয়া যায় যে ১৫৯২ সালে ওই রচনা লেখার সময় জ্যেষ্ঠদেব খুবই বৃদ্ধ। একটি মলয়ালম ভাষ্য থেকে নিশ্চিতভাবে জানা যায় যে জ্যেষ্ঠদেবের কাছ থেকে পাওয়া নির্দেশসমূহের বাখ্যার ভিত্তিতেই অচ্যুতর ওই গ্রন্থ রচিত। অচ্যুত অ-ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়ের মানুষ। তাঁরা মন্দির পরিষ্কার করা এবং ফুল ও গাছের জোগান দেওয়ার চিরাচরিত কাজে নিযুক্ত ছিলেন। কোনো কোনো নাম্বুথিরি পরিবার তাঁদের নিযুক্ত করতেন ফলিত জ্যোতিষভিত্তিক ক্যালেন্ডার (পঞ্চগম) ও সময় নির্ধারণ সংক্রান্ত অগ্রসর শিক্ষাদানের জন্য। তিনিও দক্ষিণ মালাবারের পোন্নানি তালুকের অন্তর্গত ত্রক্কান্তিয়ুর-এর মানুষ , যে অঞ্চলটি কেরালার গণিতচর্চার উপকেন্দ্র রূপে প্রসিদ্ধ।
অচ্যুত ছিলেন বিশিষ্ট বিদ্বান। জ্যোতির্বিজ্ঞান ছাড়াও তিনি সাহিত্য এবং চিকিৎসাশাস্ত্রে কৃতী ছিলেন। তিনি ভেনাড-এর রাজা রবি বর্মার নজরে পড়েন এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানে কুশলতার জন্য সর্বোচ্চ প্রশংসা অর্জন করেন। সমসাময়িক আর একজন পণ্ডিত বাসুদেব তাঁকে প্রভু শিব-এর চেয়েও গুণী বলে অভিহিত করেছিলেন! তাঁর প্রধান কৃতিত্বের পরিচয় মেলে তাঁর ‘স্পুটনার্ণয়’(১৫৯৩-এর আগে রচিত) গ্রন্থে। এখানে তিনি ভারতের জ্যোতির্বিজ্ঞানের ইতিহাসে প্রথম ‘এক্লিপ্টিক রিডাকশন’ নামক প্রক্রিয়াটির প্রবর্তন করেন (কোনো জ্যোতিষ্কর স্থানাঙ্ককে নিরক্ষীয় থেকে ক্রান্তিবৃত্তীয় স্থানাঙ্ক গণনব্যবস্থায় রূপান্তর ঘটানোর জন্য প্রয়োজনীয় অদলবদল করার পদ্ধতি)। একই সময় পশ্চিমের জ্যোতির্বিজ্ঞানে টাইকো ব্রাহে এর প্রবর্তন করেছিলেন। ‘স্পুটনার্ণয়’-এর যুক্তিসিদ্ধতা প্রতিপাদন করা হয়েছিল ‘রাশিগোলাস্ফুতিতি’ গ্রন্থে।
অন্যন্য রচনাতেও অচ্যুত তাঁর বহুমুখী গুণপনার প্রমাণ রাখেন। তিনি কেবল জ্যোতির্বিজ্ঞানের প্রামাণিক গ্রন্থ রচনা করেই ক্ষান্ত হননি, উপরন্তু ফলিত জ্যোতিষের ওপরেও বই লিখেছিলেন, যথা ‘জাতকভরণপদ্ধতি’ এবং ‘হোরাসারোচ্চয়’ । এছাড়া মাধবের ভেনভারোহ-র একটি ভাষ্যও রচনা করেছিলেন। কবি ও বৈয়াকরণ মেলপাত্তুর নারায়ণ ভট্ট, জ্যোতিষবিদ ত্রপাণিক্কর পোড়ুভাল প্রমুখ তাঁর শিষ্য।
পুটুমান
চার্লস উইশ-এর ১৮৩২-এর সন্দর্ভটি বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। সেই প্রথম কেরালা ঘরানার গণিত ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের অস্তিত্বের খবর বহির্বিশ্বে পৌঁছল। ওই সন্দর্ভের একটি অনুচ্ছেদে রয়েছে: ‘করণপদ্ধতির রচয়িতা ছিলেন মালাবারের ত্রিসিভুর (ত্রিচুর)-এর এক নাম্বুথিরি ব্রাহ্মণ পুটুমান সোমাইয়াজিন। তাঁর নাতি সত্তর বছর বয়সে জীবিত আছেন’। শুধু কেরালায় নয়, আজকের তামিলনাড়ু এবং অন্ধ্র প্রদেশ প্রমুখ প্রতিবেশি অঞ্চলেও কেরালার গণিত ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের প্রচার ও প্রসারে এই ‘করণপদ্ধতি’ ছিল এক মুখ্য উপকরণ। ‘করণপদ্ধতি’র খতিয়ান পাওয়া যায় ১৭৩২ সালে, জ্যেষ্ঠদেব-এর ‘যুক্তিভাষ’-এর ২০০ বছর পরে। ত্রিচুরের কাছে কোভ্ভরম গ্রামে এক নাম্বুথিরি ব্রাহ্মণ ঘরে এর রচয়িতার জন্ম। সেখানে চিরাচরিত জ্যোতির্বিজ্ঞানের চর্চাকারী পুটুমান নামধারী একটি বাড়ি এখনো আছে। ‘করণপদ্ধতি’ কেরালার গণিত ও জ্যোতির্বিজ্ঞান বিষয়ে এক পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ। এর একটি অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য হল, এতে সাধারণভাবে ‘পরহিত’ প্রণালীই অনুসৃত হলেও, কেবল গ্রহণের গণনায় ‘দৃগ্গণনা’ প্রণালী অনুসরণ করার পক্ষে কথা বলা হয়েছে। এর দশটি অধ্যায়ে আলোচিত হয়েছে পূর্ববর্তী রচনাগুলিতে উত্থাপিত নানা প্রশ্ন। যথা, অনির্দিষ্ট মানসম্পন্ন (ইনডিটারমিনেট) সমীকরণ সমাধানের পুট্টাকার পরিমার্গ, পাই (π)- এর এবং কোণসমূহের সাইন ও কোসাইনের উহ্য মানের ডেরিভেশন, অর্থাৎ কোনো ফাংশনের তাৎক্ষণিক পরিবর্তনের হার পরিমাপের পদ্ধতি, যার সাহায্যে একটি বক্ররেখার যেকোনো বিন্দুর উপর স্পর্শকরেখার ঢাল মাপা যায়। এর বিষয়ব্যাপ্তি মোটের ওপর ‘যুক্তিভাষ’-এরই মতো হলেও প্রাকরণিক খুঁটিনাটি বর্জিত প্রাঞ্জলতার কল্যাণে এটি বিভিন্ন ভাষ্যের উৎস হয়ে ওঠে: দুটি মলয়ালমে, দুটি তামিলে, একটি সংস্কৃতে। আপাতত এই কটিরই সন্ধান পাওয়া গেছে। এ বইতে আদি সূত্র অনুসরণ করে নানাবিধ ফরমুলায় উপনীত হওয়ার পদ্ধতি এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানের বিভিন্ন ধ্রুবকের সারণি রচনা করা হয়েছিল।
পুটুমান সোমাইয়াজি এ ছাড়াও একটি প্রাথমিক ব্যবহার-নির্দেশিকা লিখেছিলেন। এর উদ্দেশ্য ছিল “স্থূল-মস্তিষ্কদের জন্য জ্যোতির্বিজ্ঞানের যুক্তিশীলতা প্রতিপাদন’’ ব্যাখ্যা করা। আরও লিখেছিলেন ‘ভেনভারাষ্টক’ নামক প্রয়োগমুখী রচনা যার সাহায্যে নিয়মিত কাল অন্তর অন্তর চাঁদের অবস্থান নির্ণয় করা যায়।
অচ্যুতের পর কেরালায় আর বিশেষ মৌলিক কাজ হয়নি। তবে ধর্মবিশ্বাসী ব্যক্তিদের দৈনন্দিন কাজের জন্য ‘মুহূর্ত’ গণনা এবং জাতক চর্চার প্রয়োজনে সংশোধনী ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের পঞ্জিকা রচনার কাজ আগের মতোই দীর্ঘদিন ধরে চলেছিল। পঞ্চগ্রাম ক্যালেন্ডার সংকলনের জন্য মাঝে মাঝে পরিমার্জনের (“স্ফুট’’) দরকার হত। ‘করণপদ্ধতি’ রচনার ১০০ বছর পর কেরালা ঘরানার শেষ পরিচিত গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়। লেখক ছিলেন উত্তর কেরালার কটত্তানাড অঞ্চলের রাজপরিবারের লোক। ১৮২৩-এ রচিত তাঁর ‘সদ্রত্নমালা’ বইটিতে কেরালা ঘরানার বহু ফল অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, কিন্তু পুরোনো রচনাগুলিতে যেসব যুক্তিপ্রমাণ ও ডেরিভেশন ছিল সেগুলো বাদ গেছে।
এতবড়ো এক ঐতিহ্যের এই সংক্ষিপ্ত বিবরণে স্বভাবতই রাজপথের অল্প কয়েকটি দিক্চিহ্নই কেবল উল্লেখিত হল।
(সমাপ্ত)
অনুবাদ- আশীষ লাহিড়ী
