প্রাচীন গ্রহাণুতে জিন উপাদান

প্রাচীন গ্রহাণুতে জিন উপাদান

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ৮ নভেম্বর, ২০২৬

পৃথিবীতে প্রাণের উৎপত্তি কীভাবে হয়েছিল, এ নিয়ে বিজ্ঞানীদের অনুসন্ধান দীর্ঘদিনের। এবার সেই সংক্রান্ত আরও এক গুরুত্বপূর্ণ সূত্র মিলল মহাকাশ থেকে। জাপানের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা জাক্সার হায়াবুসা-২ অভিযানে সংগৃহীত রিউগু নামক গ্রহাণুর নমুনায় DNA ও RNA তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় পাঁচটি মৌলিক উপাদানই খুঁজে পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। প্রায় ৪৫০ কোটি বছরের পুরোনো এই গ্রহাণুর নমুনায় প্রাণের উৎপত্তির সঙ্গে সম্পর্কিত সব কটি উপাদানের উপস্থিতি প্রমাণ করে, পৃথিবীতে প্রাণের আবির্ভাবের বহু আগেই সৌরজগতের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রাণের রাসায়নিক উপাদান তৈরি হয়ে থাকতে পারে।

আমরা জানি, DNA ও RNA-তে জিনগত তথ্য সংরক্ষিত থাকে। এই তথ্যের সাহায্যেই জীবদেহের বৃদ্ধি, বংশবিস্তার ও বিবর্তন সম্ভব হয়। DNA ও RNA গঠনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয় পাঁচটি নাইট্রোজেনযুক্ত জৈব অণু বা নিউক্লিয় বেস—অ্যাডেনিন, গুয়ানিন, সাইটোসিন, থাইমিন ও ইউরাসিল। এগুলিকে জীবনের জিন অক্ষর বলা হয়। এই অণুগুলি শর্করা ও ফসফেটের সঙ্গে যুক্ত হয়ে নিউক্লিওটাইড তৈরি করে, যা DNA ও RNA-র মূল গঠনগত উপাদান।

২০২০ সালে জাপানের হায়াবুসা-২ মহাকাশযান রিউগু গ্রহাণু থেকে মোট ৫.৪ গ্রাম নমুনা পৃথিবীতে নিয়ে আসে। ২০২৩ সালে গবেষকেরা ওই নমুনায় ইউরাসিলের সন্ধান পেয়েছিলেন। এবার জাপানি বিজ্ঞানীদের একটি দল আরও বিশদ বিশ্লেষণ করে পাঁচটি নিউক্লিয় বেসেরই উপস্থিতি নিশ্চিত করেছেন। তাঁদের গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়েছে নেচার অ্যাস্ট্রোনমি পত্রিকায়।

গবেষণার জন্য বিজ্ঞানীরা রিউগুর দুটি নমুনা পরীক্ষা করেন। পৃথিবীর পরিবেশের সংস্পর্শে এসে যাতে নমুনাগুলি দূষিত না হয়, সে জন্য বিশেষ পরিচ্ছন্ন পরীক্ষাগার ব্যবহার করা হয়। জল ও হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিডের সাহায্যে নমুনা থেকে জৈব অণুগুলি বের করে নিয়ে সেগুলিকে বিশুদ্ধ করার পর শনাক্ত করা হয়। নমুনায় পাঁচটি উপাদানই পাওয়া গিয়েছে এবং সেগুলির পরিমাণও মোটামুটি কাছাকাছি।

এই আবিষ্কার আগের কয়েকটি গবেষণার ফলকেও সমর্থন করে। ২০২৫ সালে নাসার বেন্নু গ্রহাণু থেকে আনা নমুনাতেও পাঁচটি নিউক্লিয় বেসের সন্ধান মিলেছিল। এ ছাড়া ১৯৬৯ সালে অস্ট্রেলিয়ায় পতিত মারচিসন এবং ১৮৬৪ সালে ফ্রান্সে পাওয়া অর্গুয়েল উল্কাপিণ্ডেও বিভিন্ন জৈব অণুর উপস্থিতি জানা গিয়েছিল।

তবে বিভিন্ন গ্রহাণুতে এই উপাদানগুলির অনুপাত এক নয়। মারচিসন উল্কাপিণ্ডে পিউরিনের পরিমাণ বেশি, অন্যদিকে বেন্নু ও অর্গুয়েলে পাইরিমিডিনের আধিক্য। অ্যামোনিয়ার মতো রাসায়নিক পদার্থ এই পার্থক্যের জন্য দায়ী হতে পারে বলে বিজ্ঞানীদের ধারণা।

গবেষকদের মতে, এই ফলাফল থেকে বোঝা যায়, প্রাণের উৎপত্তির প্রয়োজনীয় রাসায়নিক উপাদান মহাকাশেও তৈরি হতে পারে। পরবর্তী সময়ে গ্রহাণু ও উল্কাপিণ্ডের মাধ্যমে সেগুলি আদিম পৃথিবীতে পৌঁছেছিল বলেও মনে করা হচ্ছে। তবে এই আবিষ্কার মহাকাশে প্রাণের অস্তিত্ব প্রমাণ করে না । কিন্তু পৃথিবীতে প্রাণ সৃষ্টির জন্য প্রয়োজনীয় উপাদান যে মহাকাশে আগে থেকেই ছড়িয়ে ছিল, তার প্রমাণ দেয় । ফলে পৃথিবী গ্রহের প্রাণ সৃষ্টির ইতিহাস হয়তো শুধু এই গ্রহের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং তার শিকড় ছড়িয়ে রয়েছে প্রাচীন সৌরজগতের রাসায়নিক বিবর্তনের গভীরেও।

সূত্র: A complete set of canonical nucleobases in the carbonaceous asteroid (162173) Ryugu by Toshiki Koga, Yasuhiro Oba,et.al; Published in Nature Astronomy, 2026; 10 (5): 655 DOI: 10.1038/s41550-026-02791-z

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

3 + nine =