নীল নদের তীরে পিরামিড ওঠারও বহু আগে, এমনকি ফারাওদের যুগ শুরু হওয়ারও কয়েক শতাব্দী আগে, মিশরে কোনো এক ব্যক্তি একটি ধাতু ঘুরিয়ে নিখুঁতভাবে গর্ত তৈরি করছিলেন। প্রায় ৫,৩০০ বছরের পুরোনো একটি তামা-মিশ্র ধাতুর সরঞ্জামকে এখন প্রাচীনতম মিশরীয় ‘ঘূর্ণন ড্রিল’ হিসেবে নিশ্চিতভাবে চিহ্নিত করেছেন গবেষকেরা। এই আবিষ্কার প্রাক-রাজতান্ত্রিক মিশরের প্রযুক্তিগত দক্ষতা সম্পর্কে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করছে। ছোট্ট, সূচের মতো ধাতব বস্তুটি বহুদিন ধরে সংরক্ষিত ছিল কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগ্রহে। এর দৈর্ঘ্য মাত্র আড়াই ইঞ্চি। মাথায় জড়িয়ে আছে ভঙ্গুর চামড়ার প্যাঁচ। দেখতে সাধারণ হলেও, এই বস্তুই প্রমাণ দিচ্ছে, প্রাচীন মিশরে যন্ত্রচালিত ঘূর্ণন প্রযুক্তি আগে যা ধারণা করা গিয়েছিল তার চেয়ে অনেক পূর্ব থেকেই ব্যবহৃত হত। নিউক্যাসল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ড. মার্টিন ওডলার বস্তুটি নতুন করে পরীক্ষা করে, তার অগ্রভাগে বিশেষ ক্ষয়চিহ্ন লক্ষ্য করেন। সূক্ষ্ম সমান্তরাল আঁচড়, প্রান্তের গোলাকার ক্ষয় এবং কাজের অংশে সামান্য বাঁক- এসবই বুঝিয়ে দেয়, এটি হাতে ঠেলে গর্ত করার যন্ত্র নয়। বরং ঘুরিয়ে চালানো একটি প্রকৃত ড্রিল বিট। অণুবীক্ষণ যন্ত্রে দেখা গেছে, তামার মাথায় একই দিকে চলা সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম দাগ রয়েছে। ঘোরানোর সময় বালি বা ঘর্ষণকারী কণিকা ধাতুর গায়ে ঘষে ঘষে এমন রেখা তৈরি হয়েছে। শুধু চাপ দিয়ে ঠেললে এমন চিহ্ন হয় না। অর্থাৎ, এটি ঘূর্ণনগতিতেই যে ব্যবহৃত হয়েছিল তা নিয়ে গবেষকদের আর সন্দেহ নেই। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হলো চামড়ার ছয়টি পাক। এত প্রাচীন কোনো জৈব উপাদান টিকে থাকার ঘটনা বিরল। গবেষকদের ধারণা, এটি ছিল ‘ধনুকাকৃতি ড্রিল’-এর অংশ। এটি ধনুকের মতো কাঠি ও দড়ি দিয়ে চালিত এক- হাতে -চালানো যন্ত্র। ধনুক সামনে-পেছনে টানলে দড়ি শ্যাফ্টে পাক খেয়ে দ্রুত ঘোরে। এই প্রক্রিয়ায় কম শক্তিতে নিয়ন্ত্রিতভাবে গর্ত করা যায়। ড্রিলটি উদ্ধার হয় নীল নদ উপত্যকার বাদারি অঞ্চলের ৩৯৩২ নম্বর সমাধি থেকে। সমাধিটি এক প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের। ওজন মাত্র ০.০৫ আউন্স। সমাধিতে কোনো সরঞ্জাম পাওয়া গেলে তা কখনও মৃত ব্যক্তির পেশার ইঙ্গিত দেয়। তবে বস্তুটির ব্যবহার কী ছিল, তা সাধারণত বোঝা কঠিন। এখানে ক্ষয়চিহ্ন ও চামড়ার অবশেষই তার ব্যবহার স্পষ্ট করেছে। রাসায়নিক পরীক্ষায় আরও তথ্য পাওয়া গেছে। সুবহ এক্স-রে ফ্লুরোসেন্স স্ক্যানারে দেখা যায়, তামাটি পুরোপুরি বিশুদ্ধ নয়। এতে আর্সেনিক, নিকেল, সামান্য সীসা ও রূপার উপস্থিতি রয়েছে। এই উপাদানগুলো ধাতুকে আরও শক্তপোক্ত বা টেকসই করতে পারে। অর্থাৎ, ধাতু মেশানোর কাজটি সম্ভবত ইচ্ছাকৃত ছিল। এ থেকে সেই সময়ের উন্নত ধাতুবিদ্যা জ্ঞানের ইঙ্গিত মেলে। ড্রিল প্রযুক্তি প্রাচীন কারুশিল্পে বড় পরিবর্তন আনে। কাঠ, পাথর বা পুঁতিতে নিখুঁত গর্ত করা গেলে অলংকার তৈরি সহজ হয়, আসবাব মজবুতভাবে জোড়া দেওয়া যায়, কাজের গতি বাড়ে। পরবর্তী যুগের মিশরীয় সমাধিচিত্রেও ধনুক ড্রিল ব্যবহারের দৃশ্য দেখা যায়। যেমন পশ্চিম থিবসের রেহমিরে-র সমাধিচিত্র, যা বর্তমানে দ্য মেট্রোপলিটন মিউজিয়াম অব আর্ট-এ সংরক্ষিত রয়েছে। গবেষকদের মতে, এই আবিষ্কার প্রমাণ করে যে নির্ভরযোগ্য ঘূর্ণন ড্রিল প্রযুক্তি মিশরে আগে যা ধারণা করা গিয়েছিল তার চেয়ে অন্তত দুই হাজার বছর আগে থেকেই প্রচলিত ছিল। এতদিন সংরক্ষিত উদাহরণ না থাকায় এর প্রাচীনতা ধরা পড়েনি। তবে সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। ড্রিলটির সঙ্গে কোনো কাঠ, পাথর বা শাঁসের নমুনা পাওয়া যায়নি। কাঠের ধনুকও টিকে নেই। ফলে বাস্তবে এটি কত দ্রুত ঘুরত বা কত গভীরে গিয়ে কাটত, তা সরাসরি পরীক্ষা করা সম্ভব হয়নি। বহু শতাব্দীর ক্ষয়ও পৃষ্ঠের চিহ্ন কিছুটা বদলে দিতে পারে। তারপরও ধাতব অগ্রভাগ, চামড়ার প্যাঁচ এবং অণুবীক্ষণিক ক্ষয়চিহ্ন—এই তিনটি প্রমাণ একসঙ্গে দেখাচ্ছে, প্রাচীন মিশরের কারুশিল্পে উন্নত হস্তচালিত ড্রিল প্রযুক্তি প্রচলিত ছিল। এখন গবেষকদের লক্ষ্য, একই ধরনের ক্ষয়চিহ্নযুক্ত আরও সরঞ্জাম খুঁজে বের করা- যাতে ইতিহাস আরও দৃঢ় প্রমাণের ওপর দাঁড়াতে পারে।
সূত্র: Egypt and the Levant; Earth . com February 2026
