প্রাণীদের দিকবোধের স্নায়ুবিজ্ঞান

প্রাণীদের দিকবোধের স্নায়ুবিজ্ঞান

অঙ্কিতা গাঙ্গুলী
বিজ্ঞানভাষ সম্পাদকীয় বিভাগ
Posted on ৯ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬

মানুষের মতোই অনান্য প্রাণীরাও জানে সে কোন দিকে যাচ্ছে – উত্তর না দক্ষিণ দিক, কোথায় আছে, আর কীভাবে ফিরতে হবে। কিন্তু এই দিকবোধ কোনো সহজ প্রবৃত্তি নয়; এটি মস্তিষ্কের ভেতরে গড়ে ওঠা এক জটিল স্নায়ুবৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ার ফল। দীর্ঘদিন ধরে বিজ্ঞানীরা এই রহস্য উন্মোচনের চেষ্টা করে আসছেন গবেষণাগারের সীমাবদ্ধ পরিবেশে। এবার সেই অনুসন্ধান পৌঁছে গেছে প্রকৃতির খোলা আকাশের নীচে—ভারত মহাসাগরের একটি নির্জন দ্বীপে। সেখানে তাঁরা লক্ষ্য করেছেন বাদুড়ের মস্তিষ্কের ভেতরের এক আশ্চর্য নেটওয়ার্ক, যা প্রাণীদের ভেতরের দিকনির্দেশক কম্পাস হিসেবে কাজ করে।

২০২৬ সালের জানুয়ারিতে সায়েন্স জার্নালে প্রকাশিত এই গবেষণায় দেখা গেছে, মিশরীয় ফলখেকো বাদুড় নতুন পরিবেশে উড়ে বেড়ানোর সময় তাদের মস্তিষ্কের বিশেষ কিছু স্নায়ুকোষ সক্রিয় হয়, যেগুলো দিকনির্দেশনা তৈরি করে। এই স্নায়ুকোষগুলোর কাজ কোনো চৌম্বক ক্ষেত্র বা আকাশের তারার/চাঁদের ওপর নির্ভরশীল নয়। বরং তারা পরিবেশের দৃশ্যমান বৈশিষ্ট্যগুলিকে ব্যবহার করে একটি মানসিক মানচিত্র তৈরি করে, যেমন- উপকূলরেখা, আশ্রয়স্থল বা পরিচিত চিহ্ন।

এই মিশরীয় ফলখেকো বাদুড়রা উড়তে সক্ষম, এদের দৃষ্টিশক্তি প্রখর এবং এরা পরিবেশ বোঝার ক্ষেত্রে অসাধারণ দক্ষ এক স্তন্যপায়ী প্রাণী। এই গবেষণার নেতৃত্ব দেন ইসরায়েলের ওয়াইজম্যান ইনস্টিটিউটের স্নায়ুবিজ্ঞানী নাখুম উলানোভস্কি। তাঁর দীর্ঘদিনের স্বপ্ন ছিল স্তন্যপায়ী প্রাণীর দিকনির্দেশ-সংক্রান্ত স্নায়ুকোষগুলোকে প্রকৃত পরিবেশে পর্যবেক্ষণ করা। কারণ গবেষণাগারের ছোট বাক্সে প্রাণীদের চলাচল প্রকৃত দিক নির্দেশনার মতো হয় না। বাস্তব জগতে চলার সময় প্রাণীদের একসঙ্গে অনেক তথ্য সামলাতে হয়—দূরত্ব, স্মৃতি, গতি, প্রতিবন্ধকতা। এতকিছু ল্যাবে পুরোপুরি ধরা পড়ে না। সেই উদ্দেশ্যে তিনি এই বাদুড়দের নিয়ে যান তানজানিয়ার উপকূল থেকে প্রায় ২৫ মাইল দূরে অবস্থিত লাথাম দ্বীপে। মাত্র সাত একর আয়তনের এই দ্বীপ জনমানবশূন্য, বৃক্ষহীন, এর এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত এক নজরে দেখা যায় না। সব মিলিয়ে দিকনির্দেশনা নিয়ে গবেষণার জন্য এ এক আদর্শ প্রাকৃতিক পরীক্ষাগার।

গবেষকেরা ছয়টি বাদুড়ের মস্তিষ্কে অতি সূক্ষ্ম তার বসিয়ে তাদের উড়ানের সময়কালীন স্নায়বিক কার্যকলাপ রেকর্ড করেন। রাতে বাদুড়গুলোকে ছেড়ে দেওয়া হতো, আর ভোরে আবার ধরে এনে তথ্য সংগ্রহ করা হতো। প্রথম কয়েক রাত বাদুড়ের দিকবোধ ছিল বেশ অস্পষ্ট। কিছু স্নায়ুকোষ মোটামুটি পূর্ব, পশ্চিম বা দক্ষিণমুখী হলে সক্রিয় হচ্ছিল। কিন্তু পাঁচ-ছয় রাতের মধ্যেই পরিস্থিতি বদলে যায়। বাদুড়েরা দ্বীপের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের মস্তিষ্কের “হেড ডিরেকশন সেল” বা দিকনির্দেশক স্নায়ুকোষগুলো নির্দিষ্ট দিকের জন্য স্থায়ীভাবে সক্রিয় হতে শুরু করে। দ্বীপের যেখানেই থাকুক না কেন, নির্দিষ্ট দিক মানেই নির্দিষ্ট স্নায়ুকোষের সক্রিয়তা—একটি বৈশ্বিক কম্পাসের মতো। এই পর্যবেক্ষণ একটি পুরোনো বিতর্কের নিষ্পত্তি করল। এতদিন বিজ্ঞানীদের মধ্যে দুটি তত্ত্ব ছিল। একাংশের ধারণা ছিল, বড় পরিবেশে প্রাণীর দিকবোধ খণ্ডিত হয়ে যায়— এক এলাকায় উত্তর মানে অন্য এলাকায় পূর্ব। একে বলা হতো “মোজাইক” তত্ত্ব। অন্যদিকে “গ্লোবাল কম্পাস” তত্ত্ব বলত, দিকনির্দেশ সর্বত্র একই থাকে। লাথাম দ্বীপের বাদুড়েরা স্পষ্ট করে দেখিয়ে দিল—মস্তিষ্ক একটি বৈশ্বিক কম্পাসই ব্যবহার করে।

আরও আশ্চর্যের বিষয়, এই দিকবোধ তৈরি করতে বাদুড়েরা আকাশের তারা, চাঁদ বা পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্রের ওপর নির্ভর করেনি। মেঘে আকাশ ঢেকে গেলেও স্নায়ুকোষের কার্যকলাপে তেমন পরিবর্তন হয়নি। গবেষকেরা মনে করছেন, বাদুড়েরা দ্বীপের ভৌগোলিক চিহ্ন—উপকূল, গবেষকদের তাঁবু, বিশ্রামের জায়গা, এসবকে মানসিক মানচিত্রে যুক্ত করে নিজেদের দিকবোধ স্থির করেছে। এই গবেষণার গুরুত্ব বাদুড়ের জগৎ ছাড়িয়ে মানুষের ক্ষেত্রেও প্রসারিত। বিজ্ঞানীদের ধারণা, মানুষের মস্তিষ্কেও অনুরূপ “হেড ডিরেকশন সেল” থাকতে পারে, যদিও এখনো সেগুলো সরাসরি শনাক্ত করা যায়নি। আমরা যখন হঠাৎ বুঝতে পারি যে ভুল পথে হাঁটছি, অথবা মুহূর্তের মধ্যে নিজেকে পুনরায় ঠিক পথের দিকে নিয়ে যাই— তখন এই অনুভূতিগুলোর পেছনে হয়তো ঐ অভ্যন্তরীণ কম্পাসই কাজ করে।

এই গবেষণা থেকে পাওয়া সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো গবেষণা পদ্ধতি নিয়ে। এতদিন স্নায়ুবিজ্ঞান জটিলতাকে নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছে ল্যাবের ছোট ঘরে প্রাণী রেখে। কিন্তু এই গবেষণা দেখিয়ে দিল, বাস্তব জগতে স্নায়ুকোষ আরও সমৃদ্ধভাবে কাজ করে, আরও বেশি তথ্য বহন করে। প্রকৃতিই মস্তিষ্ককে বোঝার সবচেয়ে বড় পরীক্ষাগার।

লাথাম দ্বীপের তারাভরা আকাশের নীচে উড়ে বেড়ানো ছয়টি বাদুড় আমাদের দেখিয়ে দিল দিকবোধ কেবল পথ খোঁজার ক্ষমতা নয়, এটি মস্তিষ্কের গভীরে লুকিয়ে থাকা এক বিস্ময়কর গণনা। আর সেই গণনা বুঝতে হলে, আমাদেরও হয়তো মাঝে মাঝে ল্যাব ছেড়ে প্রকৃতির দিকে তাকাতে হবে।

 

সূত্র: How Animals Build a Sense of Direction by staff reporter, published in science journal,quanta magazine,21st January 2026.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

4 − three =