ফলিত জ্যোতিষশাস্ত্র ও ‘বার্নাম এফেক্ট’

ফলিত জ্যোতিষশাস্ত্র ও ‘বার্নাম এফেক্ট’

সুপর্ণা চট্টোপাধ্যায়
বিজ্ঞানভাষ সম্পাদকীয় বিভাগ
Posted on ২০ জুন, ২০২৬

ভোরের আলো ফুটতেই কোটি কোটি মানুষের চোখ চলে যায় দৈনিক খবরের কাগজ কিংবা স্মার্টফোনের স্ক্রিনে : আজকের দিনটি কেমন যাবে? কোনো গুরুত্বপূর্ণ ইন্টারভিউয়ের আগে শুভক্ষণের খোঁজ করা, গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থান মেপে বিয়ের লগ্ন নির্ধারণ করা, কিংবা জীবনের বড় কোনো বাঁকে দাঁড়িয়ে জ্যোতিষীর পরামর্শ নেওয়া- এ অতি সাধারণ ঘটনা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আর রকেটের যুগে দাঁড়িয়েও এই প্রাচীন বিশ্বাসের জনপ্রিয়তা কমেনি বিন্দুমাত্র। বরং টেলিভিশন, ইউটিউব আর সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে তা আরও জাঁকিয়ে ডালপালা মেলেছে। অথচ এই শাস্ত্র আসলে মানুষের অবচেতনের ভয়, আশা আর মনস্তাত্ত্বিক প্রবণতার ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এক সুনিপুণ মায়া।

 

আকাশভরা নক্ষত্রমন্ডলীর দিকে তাকালে আকাশের এক অদ্ভুত ছবি চোখের সামনে ভেসে ওঠে। যখন মানুষ মহাবিশ্ব সম্পর্কে প্রায় কিছুই জানত না, তখন আকাশ ছিল তাদের কাছে এক রহস্যময় ক্যানভাস। নক্ষত্র কী, কেন তারা দূর আকাশে টিমটিম করে জ্বলে- তা জানার কোনো উপায় তখন ছিল না। মানুষ কেবল বিন্দুর পর বিন্দু জুড়ে তার নিজস্ব কল্পনায় তৈরি করে নিল শিকারি, সিংহ, বৃষ কিংবা কোনো বীর যোদ্ধার অবয়ব। এই রূপকগুলো ঘিরেই জন্ম নিল কালজয়ী সব পুরাণ কাহিনী। আকাশের বুক চিরে কয়েকটি উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ককে স্থান পরিবর্তন করতে দেখে প্রাচীন মানুষের বিস্ময়ের সীমা ছিল না। আজ আমরা জানি সেগুলো আসলে আমাদের সৌরজগতের গ্রহ, কিন্তু সেকালের মানুষের কাছে তারা ছিল চঞ্চল, রহস্যময় সত্তা। কোনো উত্তর না পেয়ে মানুষ তখন ধরে নিয়েছিল, এই চলমান বস্তুগুলো সাধারণ কিছু নয়—এরা স্বয়ং ঈশ্বর কিংবা দেবতাদের বার্তাবাহক। মানুষের এই অদম্য কৌতূহল এবং অজানাকে জানার ব্যাকুলতা থেকেই রোপিত হয়েছিল জ্যোতিষশাস্ত্রের বীজ।

 

খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতকের প্রখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ক্লডিয়াস টলেমিও বিশ্বাস করতেন, আকাশের এই ঘূর্ণায়মান পিণ্ডগুলো মানুষের ভাগ্যকে প্রভাবিত করে। তৎকালীন রাজন্যবর্গ যুদ্ধযাত্রা, রাজকীয় সিদ্ধান্ত কিংবা আবহাওয়ার পূর্বাভাস পেতে জ্যোতিষীদের ওপর নির্ভর করতেন। তবে টলেমি নিজেও জানতেন যে এই বিদ্যা নির্ভুল নয়; তিনি প্রতিনিয়ত পর্যবেক্ষণ আর অনুমানের ভিত্তিতে নিজের ধারণাকে পরিমার্জন করতেন। আজকের দিনে সেই প্রাচীন প্রথা আধুনিক প্রযুক্তির মোড়ক গায়ে জড়িয়েছে। এখন কম্পিউটারে জন্মক্ষণ আর স্থান বসিয়ে দিলেই চোখের পলকে তৈরি হয়ে যায় জটিল এক জন্মছক। কিন্তু একটু গভীরভাবে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, এই ছকের ব্যাখ্যাগুলো এতটাই নির্বিশেষ এবং সর্বজনীন যে, তা যেকোনো মানুষের জীবনের সঙ্গেই মিলে যেতে পারে।

ভারতীয় উপমহাদেশে জ্যোতিষশাস্ত্রের সবচেয়ে চকমকে এবং ভীতিপ্রদ অধ্যায়টি আবর্তিত হয় শনি গ্রহ এবং তার ‘সাড়ে সাতি’-কে কেন্দ্র করে। শনি এক নিষ্ঠুর, দণ্ডদাতা দেবতা। ব্যবসায়ে ক্ষতি, পারিবারিক অশান্তি বা আকস্মিক অসুস্থতার দায় নির্দ্বিধায় চাপিয়ে দেওয়া হয় শনির অশুভ দৃষ্টির ওপর। কিন্তু বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে শনি হলো পৃথিবী থেকে গড়ে প্রায় ১.২ থেকে ১.৭ বিলিয়ন কিলোমিটার দূরের এক বিশাল গ্যাসীয় পিণ্ড, যা পদার্থবিজ্ঞানের অমোঘ নিয়ম মেনে মহাকাশে আবর্তিত হচ্ছে। একইভাবে, আমরা পৃথিবী থেকে যেসব রাশিচক্র বা নক্ষত্রমণ্ডলকে পাশাপাশি দেখি, তারা আসলে মোটেই একে অপরের কাছাকাছি নেই। এটি একটি দৃষ্টি বিভ্রম। দূর থেকে দেখলে একটি ল্যাম্পপোস্ট আর পেছনের বিশাল পাহাড়কে একই লাইনে আছে বলে মনে হতে পারে, কিন্তু আসলে তাদের মধ্যে মাইলের পর মাইল ব্যবধান। নক্ষত্রদের ক্ষেত্রেও তাই। কোটি কোটি কিলোমিটার দূরের একটি গ্যাসীয় পিণ্ডের অবস্থান কীভাবে একজন মানুষের চাকরি, বিয়ে বা স্বাস্থ্য নির্ধারণ করবে! তার কোনো যুক্তিসঙ্গত বা বৈজ্ঞানিক প্রমাণ আজ পর্যন্ত মেলেনি।

এর আসল উত্তর লুকিয়ে আছে মানুষের মনস্তত্ত্বে। মানুষ অনিশ্চয়তাকে ভয় পায়। যখন জীবনের কোনো আকস্মিক বিপর্যয়ের স্পষ্ট কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না, তখন গ্রহের দোষ বা ভাগ্যের ওপর দায় চাপিয়ে দিলে মন এক ধরণের সান্ত্বনা পায়। শনির ভয় আসলে গ্রহের ভয় নয়—তা হলো মানুষের নিজেরই ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা আর নিরাপত্তাহীনতার মনস্তাত্ত্বিক প্রতিফলন। আমরা যে সাত দিনের সপ্তাহ অনুসরণ করি, তার উৎসও কিন্তু প্রাচীন জ্যোতিষেই। আকাশে খালি চোখে সহজে দৃষ্ট সাতটি বস্তু—সূর্য, চন্দ্র, বুধ, শুক্র, মঙ্গল, বৃহস্পতি ও শনি-কে কেন্দ্র করে সপ্তাহের নামকরণ। কিন্তু পরবর্তীকালে দূরবীনের আবিষ্কারের পর ইউরেনাস, নেপচুন বা প্লুটোর মতো গ্রহদের সন্ধান মিলল। মিলল না শুধু রাহু আর কেতুর দেখা। প্রাচীন জ্যোতিষে স্বভাবতই এই নতুন গ্রহগুলোর কোনো উল্লেখ বা প্রভাবের কথা বলা নেই। প্রশ্ন জাগে, গ্রহের অবস্থানই যদি ভাগ্য গড়বে, তবে এই বৃহৎ গ্রহদের বাদ দিয়ে মানুষের ভাগ্য গণনা এতদিন সম্পূর্ণ হলো কীভাবে?

মনোবিজ্ঞানীরা জ্যোতিষের জনপ্রিয়তার পেছনে একটি চমৎকার ব্যাখ্যা দিয়েছেন, যাকে বলা হয় ‘বার্নাম এফেক্ট’। রাশিফলে সাধারণত এমন কিছু কথা লেখা থাকে যা সব মানুষের স্বভাবের মধ্যেই কম-বেশি বিদ্যমান। যেমন, “আপনি ভীষণ ন্যায়পরায়ণ, কিন্তু মাঝে মাঝে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধায় ভোগেন।” কিংবা “বাইরে কঠিন হলেও ভেতরে আপনি অত্যন্ত আবেগপ্রবণ।” এই সাধারণ বাক্যগুলো পড়ার পর প্রতিটি মানুষই মনে করে, “বাহ! এ তো হুবহু আমার কথাই বলা হয়েছে!” এই মনস্তাত্ত্বিক ফাঁদের কারণেই মানুষ রাশিফলের সাধারণ বক্তব্যকে নিজের জন্য এক বিশেষ দৈববাণী বলে ভুল করে।

 

ভবিষ্যতের পর্দা উন্মোচন করার তাগিদ বিজ্ঞানেরও আছে। বিজ্ঞানও ভবিষ্যৎ বাণী করে তবে তা আবহাওয়ার পূর্বাভাস, সূর্যগ্রহণের নিখুঁত সময় কিংবা কোনো রোগের জিনগত ঝুঁকি নির্ণয়ের ক্ষেত্রে। আর এই সব কিছুই করা হয় বিপুল পরিমাণ উপাত্ত, গাণিতিক হিসাব এবং প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণের ওপর ভিত্তি করে। একজন মানুষের জীবনের গতিপথ নির্ধারণের পেছনে কাজ করে তার জিনগত বৈশিষ্ট্য, চারপাশের পরিবেশ, সামাজিক পরিস্থিতি, শিক্ষা এবং অর্থনৈতিক অবস্থা। এই অগুনতি চলককে বাদ দিয়ে কেবল আকাশের গ্রহের অবস্থান দিয়ে ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করা অসম্ভব। মানুষের এই দুর্বলতা আর অজানার ভয়কে পুঁজি করে গড়ে উঠেছে কোটি কোটি টাকার মণিরত্ন, কবজ তাবিজের ব্যবসা। বিপদের ভয় দেখিয়ে মানুষকে অবৈজ্ঞানিক প্রতিকারের দিকে ঠেলে দেওয়াটা ছদ্ম-বিজ্ঞানের এক অন্ধকার দিক। বিশ্বাস করার অধিকার প্রত্যেক মানুষের ব্যক্তিগত। তবে অন্ধবিশ্বাসের চোরাবালিতে হারিয়ে যাওয়ার আগে যুক্তির আলো ছড়ানো প্রয়োজন। আকাশের দিকে তাকালে আমরা শুধু গ্রহ-নক্ষত্রই দেখি না, দেখি মানুষের আদিম কৌতূহলের এক সুবিশাল ইতিহাস। সেই কৌতূহলই একসময় জন্ম দিয়েছিল রূপকথার, আর আজ তা জন্ম দিয়েছে আধুনিক বিজ্ঞানের। বিজ্ঞান থমকে থাকে না, তা প্রতিনিয়ত নিজেকে সংশোধন করে এগিয়ে চলে। আর এখানেই বিশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা জ্যোতিষশাস্ত্রের সাথে প্রমাণের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা বিজ্ঞানের আসল ও চিরন্তন পার্থক্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

seventeen − 2 =