ফুসফুসের আদলে তৈরি শ্বাস-অনুকূল হাইড্রোজেল 

ফুসফুসের আদলে তৈরি শ্বাস-অনুকূল হাইড্রোজেল 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ৩ আগষ্ট, ২০২৬

মানবদেহের ফুসফুস একই সঙ্গে অক্সিজেন গ্রহণ এবং কার্বন ডাই-অক্সাইড ও জলীয় বাষ্প বের করে দিয়ে শরীরকে সচল রাখে। ঠিক সেই প্রাকৃতিক নীতিকে অনুসরণ করেই ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির প্রকৌশলীরা তৈরি করেছেন এক অভিনব ব্রিদেবল/শ্বাস-অনুকূল হাইড্রোজেল। নরম, জলসমৃদ্ধ এই নতুন উপাদানটি দীর্ঘ সময় ত্বকের সংস্পর্শে থেকেও বাতাস চলাচল নিশ্চিত করতে পারে। ফলে এটি চিকিৎসা, স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ এবং পরিধানযোগ্য স্মার্ট ডিভাইস তৈরিতে অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

হাইড্রোজেল এতদিন ক্ষত ঢাকার ব্যান্ডেজ, চিকিৎসা ইমপ্লান্ট, বায়োসেন্সর এবং প্রসাধনী পণ্যে ব্যবহৃত হত। কারণ এটি অত্যন্ত নরম এবং এতে প্রচুর তরল থাকে, যা ত্বককে আর্দ্র রাখে। তবে প্রচলিত হাইড্রোজেলের একটি বড় সমস্যা হলো এটি তাপ ও জলীয় বাষ্প আটকে রাখে। ফলে দীর্ঘ সময় ব্যবহারে ঘাম জমে, ত্বকে অস্বস্তি বা জ্বালাপোড়া দেখা দেয় এবং সেন্সরের কার্যকারিতাও ব্যাহত হতে পারে।

এই সীমাবদ্ধতা দূর করতে এমআইটির গবেষকেরা হাইড্রোজেলের ভেতরে ফুসফুসের বায়ুথলিকা বা অ্যালভিওলাইয়ের মতো অসংখ্য ক্ষুদ্র বায়ু চলাচলের পথ তৈরি করেছেন। নতুন উপাদানটিতে প্রায় ৭০ শতাংশ জল থাকলেও এর মধ্যে থাকা সূক্ষ্ম বায়ু চ্যানেলের মাধ্যমে অক্সিজেন ও জলীয় বাষ্প সহজেই চলাচল করতে পারে। ফলে এটি একই সঙ্গে আর্দ্রতা ধরে রাখে এবং ত্বককে স্বাভাবিকভাবে ‘শ্বাস নেওয়ার’ সুযোগ দেয়।

এই প্রযুক্তির মূল ভিত্তি হলো ভিসকোইলাস্টিক ফেজ সেপারেশন নামে একটি বিশেষ প্রক্রিয়া। গবেষকেরা সাধারণ হাইড্রোজেলের সঙ্গে সিলিকা অ্যারোজেল কণা যুক্ত করেছেন, যা জলবিরোধী এবং অনেকটা যেন বায়ুর কঠিন বুদবুদের মতো কাজ করে। এসব কণা ক্ষুদ্র বায়ুথলিকাগুলোকে স্থিতিশীল রাখে, জলে ভরে যেতে বাধা দেয়। এর ফলে পুরো জেল জুড়ে একটি আন্তঃসংযুক্ত বায়ু সুড়ঙ্গের নেটওয়ার্ক তৈরি হয়, যা গ্যাসের আদান-প্রদানকে অত্যন্ত কার্যকর করে তোলে।

পরীক্ষাগারে এই নতুন হাইড্রোজেলটি প্রচলিত হাইড্রোজেলের তুলনায় প্রায় দশ গুণ বেশি অক্সিজেন প্রবেশ্যতা বা পারমিয়াবিলিটি অর্জন করেছে। একই সঙ্গে এটি সিলিকন ও পলিইউরেথেনের মতো বহুল ব্যবহৃত উপাদানের তুলনায় অনেক বেশি দক্ষতার সঙ্গে জলীয় বাষ্পকে বাইরে যেতে দেয়। ফলে ত্বক দীর্ঘ সময় শুষ্ক, আরামদায়ক ও সুস্থ থাকে।

মানবদেহে এই প্রযুক্তির পরীক্ষার ফলও অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। স্বেচ্ছাসেবকদের শরীরে এই হাইড্রোজেল ব্যবহার করে বেতার হৃদস্পন্দন পর্যবেক্ষণকারী সেন্সর টানা ১০ দিন লাগিয়ে রাখা হয়। নিয়মিত ব্যায়ামসহ দৈনন্দিন কাজের মধ্যেও সেন্সরগুলো নির্ভুলভাবে তথ্য সংগ্রহ করেছে। অংশগ্রহণকারীদের কারও ত্বকে জ্বালাপোড়া বা অ্যালার্জির লক্ষণ দেখা যায়নি।

গবেষকদের বিশ্বাস, এই নতুন হাইড্রোজেল ভবিষ্যতে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষত ড্রেসিং, স্মার্ট ব্যান্ডেজ, কসমেটিক ফেস মাস্ক, উন্নত চিকিৎসা ইমপ্লান্ট এবং সার্বক্ষণিক স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণকারী পরিধানযোগ্য ডিভাইসের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। প্রকৃতির অনন্য নকশাকে আধুনিক প্রকৌশলের সঙ্গে একীভূত করে তৈরি এই প্রযুক্তি আরও আরামদায়ক, নিরাপদ ও কার্যকর বায়োমেডিক্যাল যন্ত্র তৈরির পথকে নতুনভাবে উন্মুক্ত করেছে।

 

সূত্র: ScienceAlert, “Scientists Create a ‘Breathable’ Hydrogel Inspired by Human Lungs” (26 July 2026).

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

18 − ten =