ফেং ঝ্যাংয়ের ঐতিহাসিক স্বীকৃতি 

ফেং ঝ্যাংয়ের ঐতিহাসিক স্বীকৃতি 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২৫ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬

২০২৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মর্যাদাপূর্ণ জাতীয় উদ্ভাবকদের যশ-কক্ষে (“National Inventors Hall of Fame”) নবনির্বাচিত সদস্যদের তালিকায় স্থান পেয়েছেন প্রখ্যাত জিন প্রকৌশলী ফেং ঝ্যাং । জিন সম্পাদনা প্রযুক্তিতে বিপ্লব ঘটানো এবং বিশ্বের বৈজ্ঞানিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে তাঁর উদ্ভাবন ও জ্ঞানভাণ্ডার অবাধে ভাগ করে নেওয়ার জন্য তাঁকে এই সম্মানে ভূষিত করা হয়েছে । ২০২৬ সালের এই শ্রেণিতে মোট ১৫ জন উদ্ভাবক অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন, যাঁদের কাজ সেমিকন্ডাক্টর প্রযুক্তি থেকে শুরু করে বহনযোগ্য ইনহেলার পর্যন্ত বিস্তৃত বিভিন্ন ক্ষেত্রে গভীর প্রভাব ফেলেছে। এই স্বীকৃতি শুধু ব্যক্তিগত অর্জনের নয়; এটি আধুনিক জিন প্রকৌশলের এক যুগান্তকারী অধ্যায়ের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি।

ফেং ঝ্যাং বর্তমানে এমসি গভার্ন ইন্সটিটিউট ফর ব্রেইন রিসার্চের একজন গবেষক বিজ্ঞানী। পাশাপাশি তিনি ম্যাসাচুসেটস ইন্সটিটিউট অফ টেকনোলজি (এম আই টি)-তে জেমস ও প্যাট্রিসিয়া পোয়াত্রাস প্রফেসর অব নিউরোসায়েন্স হিসেবে কর্মরত। এমআইটির ব্রেইন অ্যান্ড কগনিটিভ সায়েন্সেস এবং বায়োলজিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে তাঁর যৌথ নিয়োগ রয়েছে। এছাড়াও তিনি হাওয়ার্ড হিউজেস মেডিকেল ইনস্টিটিউটের একজন তদন্তকারী এবং এমআইটির কে.লিসা ইয়াং ও হক ই. ট্যান সেন্টার ফর মলিকিউলার থেরাপিউটিকসের সহ-পরিচালক। তাঁর গবেষণা একসঙ্গে স্নায়ুবিজ্ঞান, জীবপ্রকৌশল ও চিকিৎসা উদ্ভাবনকে সংযুক্ত করেছে। সেখানে মৌলিক বিজ্ঞান ও বাস্তব প্রয়োগের সেতুবন্ধন স্পষ্ট।

ঝ্যাংয়ের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অবদান হলো মানব কোষে প্রকৌশলীকৃত CRISPR-Cas9 ব্যবস্থার মাধ্যমে জিন সম্পাদনার কার্যকারিতা প্রথম প্রদর্শন করা। তিনি দেখান CRISPR-Cas9 প্রযুক্তির মাধ্যমে একটি জৈব ‘আণবিক কাঁচি’ ডিএনএ-র নির্দিষ্ট অংশ নিখুঁতভাবে কেটে বদলে দিতে সক্ষম হয়েছে। প্রকৌশলকৃত মানবকোষে এই ব্যবস্থার কার্যকারিতা প্রথম প্রদর্শন করে ঝ্যাং ও তাঁর সহকর্মীরা দেখিয়েছিলেন, জিন সম্পাদনা আর কল্পবিজ্ঞান নয়, বাস্তব। এটি নির্ভুল চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভবিষ্যৎ। এই প্রযুক্তি জীববিজ্ঞান ও চিকিৎসাবিজ্ঞানে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন আনে। বংশগত রোগ নিরাময়, ক্যানসার গবেষণা, স্নায়বিক ব্যাধির মতো অসংখ্য জটিল চিকিৎসা-গবেষণায় এই প্রযুক্তি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। তাঁর উদ্ভাবিত প্রযুক্তিগুলিকে বাস্তব প্রয়োগে রূপ দিতে তিনি একাধিক কোম্পানি সহ-প্রতিষ্ঠা করেছেন।

কিন্তু ঝ্যাংয়ের কৃতিত্ব কেবল আবিষ্কারেই সীমাবদ্ধ নয়। তিনি বিশ্ব জুড়ে গবেষণা সহযোগিতার ওপরেও গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি বিশ্বাস করেন, বৈজ্ঞানিক জ্ঞান ভাগ করে নেওয়াই অগ্রগতির মূল ভিত। অলাভজনক জৈব-ভাণ্ডার Addgene মারফত ২০২৩ সালের মধ্যে তাঁর উদ্ভাবিত ৭৫,০০০–এর বেশি রিএজেন্ট/বিকারক বিশ্বের ৭৯টিরও বেশি দেশে গবেষকদের হাতে পৌঁছেছে। কর্মশালা, অনলাইন ফোরাম এবং নিজস্ব ল্যাবের মাধ্যমে তিনি তরুণ বিজ্ঞানীদের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন একটি অবাধ, সহযোগিতামূলক বৈজ্ঞানিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে।

ন্যাশনাল ইনভেন্টরস হল অব ফেমের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মনিকা জোন্স বলেন, এই প্রতিষ্ঠান বিশ্ব-পরিবর্তনকারী উদ্ভাবকদের উত্তরাধিকার তুলে ধরতে এবং পরবর্তী প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। যুক্তরাষ্ট্রের পেটেন্ট অ্যান্ড ট্রেডমার্ক অফিসের সঙ্গে যৌথভাবে ৭ই মে ওয়াশিংটন ডিসিতে এক অনুষ্ঠানে ঝ্যাংসহ ২০২৬ সালের সম্মানপ্রাপকদের আনুষ্ঠানিকভাবে সংবর্ধনা দেওয়া হবে।

ফেং ঝ্যাং নিজের প্রেরণার কথা বলতে গিয়ে বলেন, তাঁর মা সবসময় তাঁকে এমন কাজ বেছে নিতে উৎসাহ দিয়েছেন যা পৃথিবীর জন্য উপকারী, যা শুধু ভোগ নয়, বরং বিশ্বে নতুন কিছু সংযোজন করে। সেই দর্শনই আজ তাঁকে সফল উদ্ভাবকদের এই অনন্য আসনে বসিয়েছে। বিজ্ঞান যখন মানবকল্যাণের লক্ষ্যে নিবেদিত হয়, তখনই তা প্রকৃত অর্থে ইতিহাস রচনা করে।

 

সূত্র : Feng Zhang inducted into the National Inventors Hall of Fame

by Julie Pryor , 3rd February, 2026.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ten + 1 =