বক্সাবনের ভীম-মথ

বক্সাবনের ভীম-মথ

হীরক নন্দী
বন্যপ্রাণ সংরক্ষণ বিশেষজ্ঞ
Posted on ১৬ মে, ২০২৬

নিমাতির বনবাংলো। বক্সা বাঘবনের এক প্রান্তে খুব ঘন জঙ্গলে না হলেও পুরোদস্তুর বনবাংলো। সেকেলে কাঠের বাড়ি। রাতে একাই ছিলাম। তাই খেয়েদেয়ে তাড়াতাড়ি শুয়েছি। কলকাতায় যাই করি, জঙ্গলে ভোরেই উঠি। ওই সময় পাখিরা ডাকাডাকি করে, ঘর ছাড়ে, নিজেদের জানান দেয়।

ভোরের আলো তখনও ভালো ফোটেনি। সামনের মাঠে নেমে হাঁটাহাঁটি করছি, হঠাৎ চোখে পড়ল বাংলোয় ওঠার সিঁড়ির মাঝামাঝি যে খুঁটিটা লাগানো আছে তার মাথার দিকে একটা পিচবোর্ডের প্রজাপতি সাঁটা। সেকালে বিভিন্ন মেলায় এরকম পাওয়া যেত। প্ল্যাস্টিক বা বোর্ডের উপরে রং করা ডানা ছড়ানো সুন্দর প্রজাপতি, আকারে বেশ বড়ো, বাড়ির দেওয়ালে লাগানোর জন্য। আবার খটকাও লাগল। বারান্দায় না লাগিয়ে খুঁটির গায়ে অতটা উঁচুতে কে ওটাকে সাঁটাল ! ভাবলাম কাছে গিয়ে দেখি। আবার সিঁড়িতে উঠে কাছাকাছি এসে মনে হল বস্তুটা জীবন্ত। দৌড়ে টর্চটা নিয়ে এসে জোরালো আলো ফেলে দেখি সত্যিই তাই। প্রজাপতি নয় মথ। কিন্তু এত বড়ো ! একটা পুরোনো লম্বা টিউবলাইটের পিচবোর্ডের খোল জুটিয়ে তার পায়ের কাছে বাড়িয়ে মৃদু নাড়াচাড়া করতেই কপালজোরে তাতে উঠে এল। নিয়ে বারান্দায় ঢোকালাম। তারের জাল দেওয়া বারান্দা। সে জালের গায়ে গিয়ে উঠল। শান্তশিষ্ট প্রাণী। অবাক হয়ে খানিক চেয়ে থেকে তাকে না ছুঁয়ে যতটা সম্ভব গায়ের কাছে টেপ নিয়ে মাপলাম। পুরোপুরি মেলে ধরা দুই ডানার একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্ত প্রায় সাড়ে ১১ ইঞ্চি। চিনতাম না। ছবি তুলে, মাপ রেখে বাইরে নিয়ে ছেড়ে দিলাম। ভোরের ধূসর আকাশে ছোটোখাটো একটা ফলখেকো বাদুড়ের মতো সে উড়ে গেল গাছের মাথা ছাড়িয়ে।

তখন ফিল্‌ম-ক্যামেরার যুগ। কলকাতা ফিরে নেগেটিভ ডেভেলপ হয়ে ছবি প্রিন্ট হল। বইপত্র মিলিয়ে চিনে নিতে সময় লাগল না। তার বিশেষত্ব শুধু চেহারায় তো নয়, আকারেও। অ্যাটলাস মথ যার বিজ্ঞানসম্মত নাম (Attacus atlas)। পৃথিবীর সবথেকে বড়ো পতঙ্গগুলোর একটা। খুশি হলাম খুব। ভারতে অ্যাটলাস মথ বিরল নয়। অনেকগুলো প্রজাতির বড়ো বড়ো মথ পাওয়া যায় ভারতীয় উপমহাদেশে। কিন্তু তাদের মধ্যে এই অ্যাটলাস মথই সব থেকে বড়ো। ডানার বিস্তারে আর ডানার ক্ষেত্রফলেও। পৃথিবীর নিরিখেও অ্যাটলাস মথ সব থেকে বড়ো দু-তিনটে পতঙ্গের একটা, ইউরেশিয়ায় এক নম্বর। এর পাশাপাশি বা কাছাকাছি আছে শুধু দুই অ্যামেরিকা মহাদেশের হোয়াইট উইচ মথ (Thysania agrippina), যার ডানার বিস্তৃতি প্রায় ১৪ ইঞ্চি, অ্যাটলাস মথের থেকে দু-ইঞ্চি মতো বেশি কিন্তু ক্ষেত্রফল কম; আর ওশানিয়া মহাদেশের হারকিউলিস মথ (Coscinocera hercules) যার ডানার ক্ষেত্রফল অ্যাটলাস মথের প্রায় দ্বিগুণ, কিন্তু ডানার বিস্তৃতি কম। সম্ভবত একমাত্র নিউগিনিতে অ্যাটলাস মথ আর হারকিউলিস মথ দুটোই একসাথে পাওয়া যায়। এদের নামের দিক থেকে একটা খুব মজার ব্যাপার লক্ষ্য করার আছে। যেহেতু এদের শ্রেণিতে অন্যান্য সব পতঙ্গের তুলনায় বিশালত্বই এদের অন্যতম বিশেষত্ব, তাই এদের নামকরণ করা হয়েছে গ্রিক ও রোমান পুরাণকথার দুই প্রকাণ্ড পুরুষ ‘টাইটান অ্যাটলাস’ আর ‘হারকিউলিস’-এর নামে। এদেশে নামকরণ হলে হয়তো ভীমের নামেই হত।

অ্যাটলাস মথ পৃথিবীর পূর্ব গোলার্ধের বাসিন্দা। পাওয়া যায় ভারতে ছাড়াও নেপাল, ভুটান, দক্ষিণ-পূর্ব চিন, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, লাওস, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম, তাইওয়ান, ব্রুনেই, ফিলিপিন্‌স, আর পাপুয়া-নিউগিনিতে। তারা জঙ্গল বা জঙ্গুলে এলাকাই বেশি পছন্দ করে, সমুদ্রতল থেকে ২০০০ মিটার পর্যন্ত। অ্যাটলাস মথের জীবন বড়ো বিচিত্র। একেকটা প্রজন্মের আয়ুষ্কাল সব দশা মিলিয়ে গড়ে ৬৪ থেকে ১০০ দিন। মা-মথ ডিম পাড়ার এক থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যে ডিম ফুটে বেরিয়ে নিজের ডিমের খোলা খেয়ে তার জীবন শুরু। তারপরে তার কর্মময় শূককীট জীবন। সাধ্যমতো শাক-পাতা খেয়ে চার/পাঁচ ধাপে খোলস ছেড়ে কমবেশি রূপবদল করে বড়ো হতে সে সময় নেয় ৪ থেকে ৬ সপ্তাহ। এরপর প্রজাপতির মতো খোলাসমেত গুটি বেঁধে মূককীট দশায় পড়ে থাকে এক থেকে দেড় মাস। একদিন সুন্দর কোনও ভোরে গুটি কেটে বেরিয়ে আসে মুক্ত চরাচরে। সকাল থেকে ৮/১০ ঘন্টা বসে থাকে গুটির পাশে। এই সময়টুকুতে তার ডানা দুটো শক্ত হয়, আর পুরোপুরি খুলে যায়। এবারে শুরু তার প্রাপ্তবয়স্ক জীবন। মেয়ে মথেরা তাদের ছেড়ে বেরোনো গুটি থেকে বেশি দূরে যায় না। আশপাশেই বসে কাটায় যতক্ষণ না পুরুষ মথ এসে পৌঁছোয়। ওদিকে পুরুষ মথদের কাজ হল তাদের অত্যন্ত সংবেদনশীল পাখির পালকের মতো শুঙ্গ বা অ্যান্টেনার সাহায্যে স্ত্রী মথের হাওয়ায় ছেড়ে দেওয়া হরমোনের গন্ধ শুঁকে শুঁকে তাকে খুঁজে বার করে তার সাথে মিলিত হওয়া। এই সব কাজকর্ম তারা রাতের দিকেই করে থাকে, দিনের বেলাটা বিশ্রাম নেয়। মিলিত হওয়ার পরে স্ত্রী মথ ১৩০ থেকে ১৬০টা ডিম পাড়ে। তাদের জীবনে একবারই এই সুযোগটা হয়, কারণ পুরুষ বা স্ত্রী পূর্ণবয়স্ক অ্যাটলাস মথের জীবন সংক্ষিপ্ত, সাধারণত ৬/৭ দিনের বেশি নয়, বড়ো জোর ২ সপ্তাহ। তাদের মুখ বলে প্রায় কিছু নেই, যা আছে তা অপরিণত, খাদ্যগ্রহণে অক্ষম। তাই তারা কিছু খেতে পারে না। শূককীট দশায় দেহে জমানো স্নেহপদার্থই তার একমাত্র শক্তির উৎস। সেই সঞ্চয় শেষ হলেই তারা মরে যায়। মানুষের দিক দিয়ে দেখতে গেলে খুবই করুণ, অনশনে মৃত্যু। ওরা হয়তো সেটা উপলব্ধিই করে না।

অ্যাটলাস মথের গুটি থেকে ‘ফাগারা’ নামে এক ধরনের সিল্‌ক তৈরি হয়। এই সিল্‌কের সুতোগুলো খুব অনেকটা টানা লম্বা হয় না, কিন্তু খুব শক্ত, টেকসই, সহজে কুঁচকে যায় না। ফাগারা দিয়ে সাধারণত ছোটো ছোটো টাকাপয়সা রাখার ব্যাগ, মাফলার, স্কার্ফ, জ্যাকেট এই সব তৈরি হয়। ভারতে ফাগারা সিল্‌ক উৎপাদন হয় যৎসামান্য পরিমাণে। অ্যাটলাস মথ থেকে তৈরি সিল্‌কের আরেকটা বিশেষত্ব হল ‘এরি’ সিল্‌কের মতোই এই সিল্‌ক পাওয়ার জন্যে মথটাকে মেরে ফেলতে হয় না। মথ গুটি থেকে বেরিয়ে গেলে তার পরে সেই গুটি থেকে সিল্‌কের সুতো তৈরি করা যায়। সেই কারণেই এরি আর ফাগারা সিল্‌ক ‘অহিংসা-’ বা ‘শান্তি-সিল্‌ক’ (Peace-Silk) নামে পরিচিত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

eight − two =