বয়সে টি-সেলের ঘাটতি পূরণে লিভার 

বয়সে টি-সেলের ঘাটতি পূরণে লিভার 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১০ জানুয়ারী, ২০২৬

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ধীরে ধীরে কমে যায়। সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করা টি–সেল নামক গুরুত্বপূর্ণ কোষের সংখ্যা কমতে থাকে। আর যেগুলি থাকে সেগুলিও আগের মতো দ্রুত কাজ করতে পারে না। ফলে বয়স্ক মানুষ সহজেই সংক্রমিত হন এবং ভ্যাকসিন বা ক্যানসার চিকিৎসায় অনেক সময় কম সাড়া দেন।

এই সমস্যার নতুন সমাধানের ইঙ্গিত দিলেন এমআইটি ও ব্রড ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীরা। তাঁরা দেখিয়েছেন, লিভারের কোষকে অল্প সময়ের জন্য “পুনঃপ্রোগ্রাম” করে প্রতিরোধতন্ত্রকে আবার শক্তিশালী করা যায়। পরীক্ষায় এই পদ্ধতিতে বয়স্ক ইঁদুরের প্রতিরোধ ক্ষমতা চোখে পড়ার মতো উন্নত হয়েছে। বিজ্ঞানীদের মূল লক্ষ্য ছিল থাইমাস নামের অঙ্গটির ঘাটতি পূরণ করা। থাইমাসই শরীরে নতুন টি–সেল তৈরি ও প্রশিক্ষণের কাজ করে। কিন্তু কৈশোর পেরোনোর পর থেকেই এই অঙ্গ ধীরে ধীরে ছোট হতে থাকে। প্রায় ৭৫ বছর বয়সে থাইমাস কার্যত আর কাজই করে না। তখন শরীর আর নতুন টি–সেল তৈরি করতে পারে না।

এমআইটির গবেষকদের প্রশ্ন ছিল, থাইমাস কাজ না করলে, শরীরের অন্য কোনো অঙ্গ কি সাময়িকভাবে সেই কাজ করতে পারে? এর উত্তর খুঁজতে তাঁরা বেছে নিলেন লিভার। কারণ লিভার বয়স বাড়লেও ভালোভাবে কাজ করে, প্রচুর প্রোটিন তৈরি করতে পারে। আর সেখানে নতুন প্রযুক্তি পৌঁছে দেওয়া তুলনামূলকভাবে সহজ। উপরন্তু, শরীরের সব রক্ত, টি–সেলসহ লিভারের মধ্য দিয়েই প্রবাহিত হয়। গবেষণায় বিজ্ঞানীরা ব্যবহার করেছেন mRNA প্রযুক্তি। এই প্রযুক্তি শরীরের কোষকে নির্দিষ্ট প্রোটিন তৈরি করার নির্দেশ দেয়। তাঁরা তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেতের mRNA লিভারে পাঠান, যেগুলি টি–সেলের বেঁচে থাকা ও পরিণত হওয়ার জন্য দরকার। এই সংকেতগুলি স্বাভাবিক অবস্থায় থাইমাস থেকেই আসে। এই mRNA বিশেষ ন্যানোকণার মধ্যে ভরে ইঁদুরের শরীরে ঢোকানো হয়। কণাগুলি লিভারে পৌঁছালে, লিভারের কোষ তখন ঐ সংকেত তৈরি করতে শুরু করে। যেন লিভারই অল্প সময়ের জন্য “নকল থাইমাস” হয়ে ওঠে। ১৮ মাস বয়সি ইঁদুরে এই পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়, যা মানুষের হিসেবে মধ্যবয়সের কাছাকাছি। যেহেতু mRNA শরীরে বেশিদিন থাকে না, তাই কয়েক সপ্তাহ ধরে একাধিক ডোজ দেওয়া হয়। ফলাফল ছিল স্পষ্ট। চিকিৎসার পর ইঁদুরের শরীরে টি–সেলের সংখ্যা বেড়ে যায় এবং সেগুলো আরও সক্রিয় হয়ে ওঠে। এরপর ইঁদুরদের ভ্যাকসিন দেওয়া হলে দেখা যায়, যেসব ইঁদুর mRNA চিকিৎসা পেয়েছিল, তাদের শরীরে ভ্যাকসিনের বিরুদ্ধে সক্রিয় টি–সেলের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ক্যানসারের ক্ষেত্রেও একই রকম উন্নতি দেখা গেছে। গবেষকরা ইঁদুরের শরীরে টিউমার তৈরি করে ক্যানসারের ইমিউনোথেরাপির ওষুধ দেন। যেসব ইঁদুর এই ওষুধের পাশাপাশি mRNA চিকিৎসাও পেল, তারা বেশি দিন বাঁচল। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, এর ফল পেতে তিনটি সংকেতই দরকার। কোনো একটি বাদ দিলে পুরো সুফল পাওয়া যেত না। এবার গবেষকরা এই পদ্ধতি অন্য প্রাণীর উপর পরীক্ষা করতে চান, দেখতে চান এটি ইমিউন সিস্টেমের অন্য কোষগুলোর উপর কী প্রভাব ফেলে। গবেষণাটি এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে এবং শুধু ইঁদুরের উপরই করা হয়েছে। মানুষের ক্ষেত্রে এটি প্রয়োগ করতে আরও সময় লাগবে। তবু এই কাজ দেখিয়ে দিচ্ছে, বয়স বাড়লেও শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতাকে নতুন করে শক্তিশালী করা সম্ভব। ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তি বয়স্ক মানুষের সুস্থ ও দীর্ঘ জীবনযাপনে বড় ভূমিকা নিতে পারে।

 

সূত্র: Transient hepatic reconstitution of trophic factors enhances aged immunity. Nature, 2025.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

eighteen − three =